সম্পাদক রেজানুর গ্রেপ্তারে মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ: বাদীর ভুল, তবে দায় কার?

তুহিন সারোয়ার,অনুসন্ধানী সাংবাদিক । ঢাকা ০৪ । জুলাই । ২০২৫ । 

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুশাসনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির আড়ালে বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও স্থানীয় ক্ষমতার সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি, তার এক জলজ্যান্ত ও নগ্ন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলামের সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও নাটকীয় মুক্তির ঘটনা।

কোনো সাধারণ আইনি নোটিশ বা আগাম সতর্কতা ছাড়াই গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় এক অতর্কিত ও ঝটিকা অভিযান চালায় বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ সাদা পোশাকের দল। আন্তঃজেলা সীমানা পার হয়ে পুলিশের এই অতি-তৎপরতার লক্ষ্য কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক বা বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা ছিল না; তাদের লক্ষ্য ছিলেন জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলাম।

এর নেপথ্যে ছিল ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এ প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণভিত্তিক ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন; যেখানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি, স্বজনপ্রীতি ও ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছিল।

অনুসন্ধানের ব্যাখ্যা

এই অনুসন্ধানটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা বিবৃতির বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ আইনি জবাবদিহিতার ওপর আলোকপাত করে ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর মামলার একটি ফরেনসিক ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ প্রদান করছে। মামলার অফিসিয়াল নথিপত্র, পুলিশের কার্যপদ্ধতি এবং বিধিবদ্ধ ম্যান্ডেটগুলো মূল্যায়নের মাধ্যমে, এই প্রতিবেদনের প্রতিবেদক সাংবাদিক তুহিন সারোয়ার সেই সুনির্দিষ্ট মেকানিজম পরীক্ষা করছেন, যার মাধ্যমে জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।

দুঃখ প্রকাশ: উদারতা নয়

সাংবাদিক গ্রেপ্তারের পর প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুঃখ প্রকাশ এবং জামিনে বাধা না দেওয়ার উদ্যোগ কোনো ‘উদারতা’ নয়; এটি ছিল নিখুঁত ও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল।

প্রতিমন্ত্রী তার বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলেছেন, “তার নাম ব্যবহার করে বা তার পক্ষে দাবি করে কেউ যেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে মামলা বা অন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন।” তার এই বক্তব্য মূলত প্রমাণ করে যে মামলাটি ছিল একটি ‘প্রক্সি লিটিগেশন’ বা ছায়া মামলা, যেখানে মূল সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিজে যুক্ত না থাকলেও তার অনুসারীরা ক্ষমতার প্রভাব দেখাতে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি করেছেন।

তার প্রমাণ, প্রতিমন্ত্রী যখন প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং এই মামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানালেন, তখন মামলার বাদী—বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ—এবং তার আইনজীবী আদালতে গিয়ে বলতে বাধ্য হন যে, “এটি একটি ভুল বোঝাবুঝি ছিল এবং আমরা আসামির জামিনের বিরোধিতা করছি না, বরং জামিন সমর্থন করছি।”

একজন প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে সংবাদ প্রকাশ হলো। তার রাজনৈতিক অনুসারী বা ঘনিষ্ঠ বলয়ের একজন ব্যক্তি মামলা করলেন। আর স্থানীয় ডিবি পুলিশ প্রতিমন্ত্রীকে না জানিয়ে, গাড়ির তেল খরচের হিসাব ছাড়াই, অন্য জেলায় গিয়ে একজন সম্পাদককে গ্রেপ্তার করল।

এরপর প্রতিমন্ত্রী বুঝতে পারলেন যে বৈশ্বিক মঞ্চে তার এবং তার সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বাঁচাতে এবং আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ‘উদার ও গণমাধ্যম-বান্ধব’ সেজে দুঃখ প্রকাশ করলেন।

যদি তিনি সত্যিই গ্রেপ্তারের বিষয়ে কিছু না জানতেন, তাহলে প্রশ্ন আরও বড় হয়: তার নামে, তার রাজনৈতিক মর্যাদা রক্ষার যুক্তিতে, তার প্রভাববলয়ের মধ্যেই এমন মামলা ও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া সক্রিয় হলো কীভাবে? আর যদি তিনি সাংবাদিকের গ্রেপ্তারকে অনভিপ্রেত মনে করেন, তাহলে শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়—মামলা প্রত্যাহার, স্বাধীন তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের দাবি তোলা কি তার রাজনৈতিক দায়িত্ব ছিল না?

প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে মূলত আদালত ও পুলিশকে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়েছেন—এই মামলাটি নিয়ে তোমরা আর বেশি দূর বাড়িও না। এর ফলে বিচারক অত্যন্ত দ্রুত এবং সহজে, গ্রেপ্তারের মাত্র দুই-তিন দিনের মাথায়, জামিন মঞ্জুর করার আইনি ভিত্তি পেয়ে যান।

মন্ত্রী এই কাজটি নিজের কোনো আইনি দায়িত্ব থেকে করেননি; করেছেন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে। সম্পাদক রেজানুর ইসলামের গ্রেপ্তারের পর কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) এবং সম্পাদক পরিষদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র হৈচৈ শুরু করে।

যেহেতু সংবাদটি ছিল প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এবং প্রতিমন্ত্রী নিজেই প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলেছেন যে এই মামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি তার অনুমতি ছাড়া হয়েছে; সেহেতু আইনের দৃষ্টিতে মামলার মূল ভিত্তি বা সেখানেই ধসে যায়।

মামলাটিতে যেহেতু সাইবার মানহানির পাশাপাশি দণ্ডবিধির অধীনে চাঁদাবাজির অভিযোগ যুক্ত করা হয়েছিল এবং বাদী দাবি করেছিলেন যে তার কাছেও চাঁদা চাওয়া হয়েছে, তাই পুলিশ টেকনিক্যালি চাঁদাবাজির অংশটুকু সচল রেখে মামলাটিকে ‘বৈধ’ দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু মূল সূত্র—প্রতিমন্ত্রীর দুর্নীতির অভিযোগ—যেহেতু মন্ত্রী নিজেই নাকচ করে দিয়েছেন, তাই পুরো মামলাটির আইনি বৈধতা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও অসার হয়ে পড়ে।

বাদী আদালতে গিয়ে “আমরা জামিনের বিরোধিতা করছি না”—এমন মন্তব্য কেন করলেন?

যেখানে মন্ত্রী নিজেই মামলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, সেখানে বাদীর আইনজীবী সরাসরি “মামলাটি প্রত্যাহার করছি” না বলে শুধু “জামিনের বিরোধিতা করছি না” বললেন। আইনের নিখুঁত চশমায় দেখলে, মন্ত্রীর ‘সম্পর্কহীনতার দাবি’ এবং বাদীর ‘জামিনের বিরোধিতা না করার বক্তব্য’ সম্মিলিতভাবে এটিই প্রমাণ করে যে পুরো মামলাটি ছিল একটি ‘আইনি ফাঁদ’ বা Legal Trap।

এর উদ্দেশ্য আইনি প্রক্রিয়ায় সত্য প্রতিষ্ঠা করা ছিল না; এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সাময়িকভাবে সাংবাদিককে হেনস্তা করা এবং একটি ভীতি তৈরি করা। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মিলে যাওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়াটিকে একটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’র তকমা দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।

রেজানুর ইসলাম হয়তো জামিনে মুক্ত হয়ে ঘরে ফিরেছেন। কিন্তু ক্ষমতার এই চতুর পিছুটান বা রাজনৈতিক ব্যাকট্র্যাকিং একঝাঁক বিবেকবান ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে গেছে। দুঃখ প্রকাশ করলেই কি ক্ষমতার নগ্ন নখরাঘাত মুছে যায়? যে সাংবাদিকের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ধুলোয় মেশানো হলো, যে পরিবার মধ্যরাতের আতঙ্ক ও মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেল—তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: যদি ঘটনাটি সত্যিই “ভুল বোঝাবুঝি” হয়, তাহলে একজন সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হলো কেন?

উপসংহার: দুঃখ প্রকাশের সংস্কৃতির অন্তরালে রাষ্ট্রীয় তামাশা

রেজানুর ইসলামের এই সাময়িক মুক্তি বা জামিন কোনোভাবেই আইনের শাসনের বিজয় নয়; এটি আসলে আমাদের বিচার ও পুলিশিং ব্যবস্থার চরম দেউলিয়াত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

এটি প্রমাণ করে যে এই রাষ্ট্রে একজন নাগরিক বা সাংবাদিকের স্বাধীনতা কোনো সংবিধান বা প্রমাণের ওপর নির্ভর করে না—তা নির্ভর করে ক্ষমতাশালীদের রাজনৈতিক সুবিধা এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর।

লেখক পরিচিতি

তুহিন সারোয়ার বাংলাদেশের একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক । তার কাজের মূল বিষয়বস্তু হলো মানবাধিকার, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, শিশু শ্রম, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল শ্রম এবং গিগ ইকোনমি। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন  লেখা প্রকাশ করেন।

ORCID iD: https://orcid.org/0009-0005-1651-5193
Official Archive: https://tuhinsarwar.com/

এডিটোরিয়াল নোট :

এই মতামতভিত্তিক অনুসন্ধানী সম্পাদকীয়টি প্রকাশ্য গণমাধ্যম প্রতিবেদন, আদালত-সংক্রান্ত বিবরণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রকাশ্য বক্তব্য, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া এবং বাংলাদেশে ফৌজদারি ও সাইবার আইনের প্রাসঙ্গিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে।

Tuhin Sarwar’s Digital Presence

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *