নব্য-উদারপন্থী বিশ্বে আয়বৈষম্য: চার দশকে যেভাবে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন

কৃতিত্ব: Mykyta Dolmatov / Getty Images
By Tuhin Sarwar - Journalist
15 Min Read

নিওলিবারেল বিশ্বে আয়বৈষম্য, শ্রম অধিকার ও

তুহিন সারোয়ার। 

নিওলিবারেল বিশ্বে আয়বৈষম্য আজ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন। গত চার দশকে মুক্তবাজার, বেসরকারিকরণ, কর কমানো ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার নীতিতে অনেক দেশের GDP বেড়েছে, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। বরং বিশ্বব্যাংক, OECD ও ILO–এর বিভিন্ন ডেটা দেখায়, বহু দেশে সম্পদ ও আয়ের বড় অংশ ক্রমেই উপরের ১–১০ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

এই নিবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে নিওলিবারেল অর্থনীতি ধনীদের আরও ধনী করেছে, শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের অবস্থান দুর্বল করেছে এবং কল্যাণরাষ্ট্র, শ্রম অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়া, চীন ও লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা, গিনি সূচক, শ্রম আয়ের অংশ, অটোমেশন ও AI–এর প্রভাব এবং প্রগতিশীল করনীতি, UBI, গিগ শ্রমিকের অধিকার ও সবুজ শিল্পনীতির মতো সম্ভাব্য সমাধান এখানে আলোচিত হয়েছে।

মূল প্রশ্ন একটাই: বাজার থাকবে—কিন্তু সেই বাজার কি মানুষের জন্য কাজ করবে, নাকি বৈষম্যকে আরও গভীর করবে?


বাজার বড় হয়েছে, নাকি বৈষম্য ?

শহরের আকাশছোঁয়া ভবন, ঝলমলে শপিংমল আর নতুন মেট্রোরেলের লাইন দেখে সহজেই মনে হতে পারে—অর্থনীতি বুঝি দুর্দান্ত চলছে। সরকারি বিজ্ঞাপনে বারবার ভেসে আসে একটাই বার্তা: প্রবৃদ্ধি হয়েছে, রপ্তানি বেড়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে।

কিন্তু একই শহরের ভেতরে যখন ভোরে গার্মেন্টস কারখানার সামনে শ্রমিকদের লম্বা লাইন দেখা যায়, বা রাতে রাইডশেয়ার চালকের মুখে শোনা যায় মাসের শেষে কতটুকু আয় হাতে থাকে, তখন অন্য চিত্র স্পষ্ট হয়। সেখানে কথাটা খুবই সোজা: “ঘরভাড়া, খাবার, ওষুধ, বাচ্চার স্কুল—সবকিছুর খরচ বাড়ছে। বেতন সেই তুলনায় কতই বা বাড়ছে?”

এই বৈপরীত্যটাই গত চার দশকের নিওলিবারেল অর্থনীতি নিয়ে এখনকার বড় প্রশ্ন। ১৯৮০-এর দশক থেকে যে নীতি-ধারা বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী হয়েছে—যেখানে

  • সরকারি খাত ছোট করা,
  • বেসরকারীকরণ (privatisation),
  • নিয়ন্ত্রণ শিথিল (deregulation),
  • করপোরেট ট্যাক্স কমানো,
  • পুঁজি চলাচলের বাধা সরিয়ে দেওয়া—

এসবকেই উন্নতির সূত্র হিসেবে ধরা হয়েছিল—তার ফল এখন দুই স্তরে দেখা যাচ্ছে। একদিকে GDP বড় হয়েছে, কিন্তু অন্যদিকে বহু দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে, শ্রম অধিকার দুর্বল হচ্ছে, আর সামাজিক ন্যায়বিচার প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

আয়বৈষম্য বোঝার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাপকাঠি গিনি সূচক (Gini Coefficient)। মান ০ এর দিকে গেলে বুঝি আয়ের বণ্টন সমান, ১-এর দিকে গেলে বুঝি চরম বৈষম্য। বিশ্বব্যাংকের World Development Indicators অনুযায়ী, অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেই গত কয়েক দশকে গিনি সূচক উচ্চ মানে আটকে আছে, কোথাও কোথাও বেড়েও গেছে।

উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখা যাক। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ সেন্ট লুইস (FRED) অনুযায়ী, ২০২২–২০২৩ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসপোজেবল আয়ের গিনি সূচক প্রায় ০.৪১৭–০.৪১৮। অর্থনীতির ভাষায় এটা স্পষ্টভাবে উচ্চ বৈষম্যের ইঙ্গিত। একই সঙ্গে OECD‑এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট দেখায়, বহু উন্নত দেশে শীর্ষ ১০% মানুষের হাতে আয় ও সম্পদের যে অংশ জমেছে, তা নিচের ৪০% মানুষের যৌথ অংশের থেকেও অনেক বেশি।

প্রশ্নটা তাই খুব সোজা: বাজার টিকে গেছে, কিন্তু সমতা কি টিকেছে? আর যদি না টিকেই থাকে, তাহলে বামধারার নীতি ধারণা—সোশ্যাল ডেমোক্রেসি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন ডেভেলপমেন্টালিজম—আজও কি বাস্তব কোনো সমাধান দিতে পারে?


নিওলিবারেল নীতি কীভাবে বৈষম্য বাড়াল

নিওলিবারেল অর্থনীতির সাফল্য–ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে আছেন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক।

পিকেটি: পুঁজির আয় বনাম শ্রমের আয়

ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি Capital in the Twenty‑First Century‑এ দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের কর ও আয়ের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, যখন পুঁজির গড় রিটার্ন (r)—অর্থাৎ সুদ, মুনাফা, ভাড়া—দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির মোট প্রবৃদ্ধির হারকে (g) ছাড়িয়ে যায়, তখন সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই উপরের দিকে চলে যায়।

যারা আগে থেকেই সম্পদের মালিক (শেয়ার, জমি, ব্যবসা), তাদের প্রতি বছরের আয় তুলনামূলকভাবে দ্রুত বাড়ে। যারা কেবল শ্রম বিক্রি করে, তাদের আয় সেই গতিতে বাড়ে না। ফলে ধনী আরও ধনী হয়, মধ্য ও নিম্নবিত্ত আপেক্ষিকভাবে পিছিয়ে পড়ে

নীতি-পরিবর্তনে কার লাভ হলো

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিট্‌জ তার বই People, Power, and Profits‑এ দেখিয়েছেন, নিওলিবারেল নীতির নামে যে সংস্কারগুলো করা হয়েছে—

  • আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ কমানো,
  • বড় কর্পোরেশনের ও উচ্চ আয়ের ওপর ট্যাক্স কমানো,
  • কিছু ক্ষেত্রে শ্রম আইনের সুরক্ষা দুর্বল করা,
  • রাষ্ট্রায়ত্ত খাত বেসরকারীকরণ—

এসব মিলিয়ে লাভ হয়েছে মূলত পুঁজি‑মালিকদের। বিপরীতে, জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র অনেক জায়গায় সংকুচিত হয়েছে; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার চাপে সাধারণ মানুষের কাঁধে বেশি বোঝা চাপেছে।

অর্থনৈতিক ধরনদেশPre‑tax GiniPost‑tax Gini% হ্রাস
নিওলিবারেলযুক্তরাষ্ট্র0.4180.3906.7%
হাইব্রিড (সামাজিক বাজার)জার্মানি0.4700.29038.3%
সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিকনরওয়ে0.4200.26038.1%
সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিকসুইডেন0.4400.27038.6%

সূত্র:
বিশ্বব্যাংক – Gini Index
OECD – Society at a Glance 2024, Income & Wealth Inequalities
যুক্তরাষ্ট্র: FRED – U.S. Gini Index

 

একটাই সিস্টেম, দুই রূপ

বৈশ্বিক অসমতা গবেষক ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ Capitalism, Alone‑এ বলেন, আজ পৃথিবীতে কোনো বাস্তব বিকল্প সিস্টেম প্রায় নেই; কার্যত সবখানেই ক্যাপিটালিজম বিদ্যমান। পার্থক্য হলো, এটি দুই প্রধান রূপে কাজ করছে:

  • পশ্চিমা দেশে liberal–meritocratic capitalism,
  • চীনের মতো দেশে political capitalism

দুই সিস্টেমের রাজনৈতিক কাঠামো আলাদা, কিন্তু পুরোপুরি আলাদা নয় তাদের ফলাফল: পুঁজি‑মালিকের ক্ষমতা বাড়ছে, আর সংগঠিত শ্রমের ক্ষমতা কমছে।

ILOSTAT‑এর ডেটা দেখায়, অনেক দেশে গত কয়েক দশকে labor share of income কমেছে—অর্থাৎ জাতীয় আয়ের বড় অংশ এখন মজুরির বদলে মুনাফা হিসেবে নিচের বদলে উপর দিকে জমছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা আর শুধু থিওরির নয়; বাস্তব রাজনৈতিক অর্থনীতিরও: বামধারার নীতি ধারণা কি নিওলিবারেল কাঠামোর ভেতর থেকেই কিছু সমতা ফিরিয়ে আনতে পারে? এর উত্তর খোঁজার জন্য এখন আমরা তিনটি অঞ্চলভিত্তিক উদাহরণ—স্ক্যান্ডিনেভিয়া, চীন ও লাতিন আমেরিকা—দেখব।


উন্মুক্ত বাজারের ভেতরেও সমতা

উত্তর ইউরোপের নর্ডিক দেশগুলো—নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক—অনেক দিন ধরেই রাজনৈতিক অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে আলাদা করে উল্লেখিত। কারণ, এরা প্রমাণ করে যে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও তুলনামূলক উচ্চ সমতা একসঙ্গে সম্ভব

পরিসংখ্যান কী বলছে

OECD Income Distribution Database থেকে নর্ডিক দেশগুলোর ডেটা দেখা যায়—কর ও সামাজিক ট্রান্সফারের আগে তাদের গিনি সূচক যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য পশ্চিমা দেশের কাছাকাছি। কিন্তু কর, ভর্তুকি ও কল্যাণমূলক ব্যয়ের পরে গিনি নেমে আসে প্রায় ০.২৬–০.২৮ স্তরে—যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

এর মানে, বাজার থেকে যে বৈষম্য তৈরি হয়, তা রাষ্ট্রের পুনর্বণ্টন নীতি অনেকটাই কমিয়ে দেয়। উচ্চ করহারের বিনিময়ে নাগরিকরা যে সেবা পায়—সেটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।

শ্রম অধিকার ও বামধারার বাস্তবায়ন

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী গেস্তা এসপিং‑আনডারসেন The Three Worlds of Welfare Capitalism‑এ নর্ডিক দেশগুলোকে “social democratic regime” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই মডেলের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পেনশন, বেকার ভাতা—এসব সেবা প্রায় সবার জন্য; শুধু গরিবদের জন্য দান নয়।
  • শ্রমিক ইউনিয়ন শক্তিশালী; মজুরি ও কাজের শর্ত নির্ধারণে collective bargaining গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
  • উচ্চ আয়ের ওপর প্রগতিশীল কর আরোপ করে সেই অর্থ সামাজিক খাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

ফলে এখানে Left-wing policy ideas কেবল তত্ত্বে নয়, বাস্তব নীতিতে পরিণত হয়েছে। বাজার টিকে আছে, কর্পোরেট সেক্টরও শক্তিশালী, কিন্তু একই সঙ্গে শ্রম অধিকার ও সামাজিক ন্যায্যতা রক্ষায় রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।


চীনের Common Prosperity:

একসময়ের পরিকল্পিত অর্থনীতি চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বাজার খোলার পর গত কয়েক দশকে দেশটি অসাধারণ প্রবৃদ্ধি দেখেছে। কিন্তু এই দ্রুত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে আয়বৈষম্য

বিশ্বব্যাংকের গিনি ডেটা দেখায়, উদারীকরণের পর একসময় চীনের গিনি সূচক ০.৪-এরও ওপরে উঠে যায়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা কমে আনুমানিক ০.৩৭–০.৪০–এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

নীতির ভাষায় সমতা

এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং সামনে আনেন “Common Prosperity” স্লোগান। নীতির ভাষায় এটার উদ্দেশ্য হলো “চরম ধনী‑গরিব বিভাজন ঠেকানো” এবং “পুঁজির অসংযত প্রসার” নিয়ন্ত্রণ করা। বাস্তবে কয়েকটি দিক স্পষ্ট দেখা যায়:

  • বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবসার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, জরিমানা ও নীতিগত সীমা আরোপ।
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, হাউজিং খাতে সরকারের হস্তক্ষেপ ও ভর্তুকি বৃদ্ধি।
  • গ্রামীণ অঞ্চলে অবকাঠামো ও দারিদ্র্যহ্রাস কর্মসূচির জোরদার বাস্তবায়ন।

চীনের ডেটা অবকাঠামো ও ডিজিটাল ইয়ুয়ান (e‑CNY) পাইলট রাষ্ট্রকে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়ার নতুন ক্ষমতা দিচ্ছে। অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি এক ধরনের Socialist Market Hybrid—যেখানে বাজারকে পুরোপুরি খারিজ না করে, রাষ্ট্র নির্দিষ্ট পর্যায়ে পুঁজি ও বৈষম্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

অবশ্যই, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন এখানে জটিল; সমালোচকেরা বলেন, এই মডেলে সমতা বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। তবে খাঁটি অর্থনৈতিক অর্থে চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিওলিবারেল ফ্রি মার্কেটের চাপের মধ্যেও রাষ্ট্র চাইলে কিছু বামধারার নীতি ব্যবহার করে বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করতে পারে


লাতিন আমেরিকা: Pink Tide–এর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা

লাতিন আমেরিকা বহু দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে আয়বৈষম্যমূলক অঞ্চলের একটি। বিশ্বব্যাংকের ডেটা দেখায়, অনেক দেশের গিনি সূচক ০.৪৫–০.৫০ বা তারও বেশি।

২০০০–এর দশকের শুরুতে প্রথম “Pink Tide” ঢেউয়ে ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডরসহ বহু দেশে বাম ও মধ্য-বাম সরকার ক্ষমতায় আসে। এরা নিওলিবারেল নীতির একমুখী আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভিন্ন পথে হাঁটে।

Bolsa Família থেকে দ্বিতীয় Pink Tide

ব্রাজিলের Bolsa Família প্রোগ্রাম তার অন্যতম উদাহরণ। শর্তসাপেক্ষ নগদ স্থানান্তরের এই স্কিমে দরিদ্র পরিবারগুলো নিয়মিত নগদ সহায়তা পায়, তবে শর্ত থাকে—

  • বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হবে,
  • মৌলিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।

বিভিন্ন বিশ্বব্যাংক ও UNDP রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, এই প্রোগ্রাম দারিদ্র্য ও অপুষ্টি কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে একটু দূরে সরে পুরো চিত্রটাকে দেখলে বোঝা যায়, এই সাফল্যের বড় অংশই দাঁড়িয়ে ছিল কমোডিটি বুম–এর ওপর—তেল, তামা, সয়াবিনের উচ্চ আন্তর্জাতিক দামের কারণে সরকারি আয় বেড়েছিল।

যখন পণ্যমূল্য পড়ে যায়, বাজেট ঘাটতি বাড়ে, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মিলিয়ে অনেক জায়গায় বাম সরকারগুলো চাপের মুখে পড়ে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী কেনেথ রবার্টস Changing Course in Latin America‑এ লিখেছেন, Pink Tide প্রথম ধাপে অনেকুজায়গায় কাঠামোগত কর সংস্কার বা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বদলে দ্রুত নগদ সহায়তা ও ভর্তুকির দিকে ঝুঁকেছিল। ফলে সরকার বদল বা অর্থনৈতিক মন্দা এলে অনেক অর্জন টেকেনি।

এখন আবার Pink Tide 2.0–এর সময়ে ব্রাজিল, চিলে, কলম্বিয়া, মেক্সিকোতে নতুন করে প্রগ্রেসিভ সরকার এসেছে। কেউ সবুজ শিল্পনীতি, কেউ ট্যাক্স সংস্কার, কেউ সামাজিক ব্যয় বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে; কিন্তু গিনি সূচক এখনও অনেক দেশে উচ্চ, আর রাজনৈতিক বিভাজন এই পথকে অনিশ্চিত করে রাখছে।

লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা তাই একধরনের সতর্কবার্তা: বামধারার নীতি দরিদ্রের জীবন দ্রুত বদলাতে পারে, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া স্থায়ী সমতা তৈরি করা কঠিন।


অটোমেশন ও AI: নিওলিবারেল বৈষম্যের ওপর নতুন স্তর

কোন চাকরি ঝুঁকিতে, কার হাতে যাবে প্রযুক্তিগত রেন্ট?

যে সময়ে নিওলিবারেল অর্থনীতির বৈষম্য নিয়ে এতো কথা হচ্ছে, সেই সময়েই বিশ্ব ঢুকছে আরেক ধরণের রূপান্তরে—অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে

ILOSTATWorld Bank Jobs & Development–এর রিপোর্টগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দশকগুলোতে বহু দেশে রুটিন ধরণের কাজের বড় অংশই অটোমেশনের ঝুঁকিতে থাকবে।

এখানে “technological rent” ধারণাটা গুরুত্বপূর্ণ—মেশিন, সফটওয়্যার ও AI দিয়ে কাজ করিয়ে যে অতিরিক্ত মুনাফা তৈরি হয়, যদি তার বড় অংশই থাকে শেয়ারহোল্ডার ও টেক কর্পোরেশনের হাতে, আর শ্রমিক কেবল অনিশ্চিত গিগ কাজ বা কম বেতনের নতুন চাকরিতে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে প্রযুক্তি বৈষম্য কমানো নয়, বরং বাড়ানোর শক্তি হয়ে দাঁড়াবে।

এখানেই বামধারার নীতি—প্রগতিশীল কর, UBI, ডিজিটাল শ্রমিক অধিকার, সবুজ শিল্পনীতি—নতুন করে আলোচনায় আসছে, কারণ এগুলো ছাড়া প্রযুক্তিগত রেন্ট পুনর্বণ্টনের বাস্তব পাথওয়ে দেখা কঠিন।


সমতার জন্য বামধারার নীতি: বাস্তব নাকি কেবল আদর্শ?

আজকের বাস্তবতা হলো, বাজার থাকবে—এই বিষয়ে খুব কমই সন্দেহ আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই বাজারের ভেতরে সমতা, শ্রম অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার টিকিয়ে রাখতে আমরা কী পদক্ষেপ নেবো।

স্ক্যান্ডিনেভিয়া দেখাচ্ছে, শক্তিশালী কল্যাণরাষ্ট্র ও শ্রমিক সংগঠন থাকলে উন্মুক্ত বাজারের ভেতরেও অপেক্ষাকৃত সমতামূলক সমাজ গড়া সম্ভব। চীন দেখাচ্ছে, রাষ্ট্র চাইলে একধরনের হাইব্রিড মডেল বানিয়ে বাজারের কিছু অতিরিক্ত বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—যদিও সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন জোরালো। লাতিন আমেরিকা দেখাচ্ছে, পুনর্বণ্টনমূলক নীতিতে দরিদ্রের জীবন দ্রুত বদলানো যায়, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সেই অর্জন টেকসই হয় না।

অটোমেশন ও AI‑এর যুগে এই পাঠগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুবই মানবিক:

  • আমরা কি এমন এক বিশ্ব মেনে নেবো, যেখানে নিওলিবারেল বাজার ও প্রযুক্তিই ঠিক করে দেবে, কে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে আর কে পারবে না?
  • নাকি আমরা বেছে নেবো এমন নীতির পক্ষে দাঁড়ানো, যেখানে বাজারের লাভের ভেতরেও সমতার জন্য জায়গা থাকবে, শ্রমিকের অধিকার থাকবে, সামাজিক ন্যায়বিচার থাকবে?

এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কেবল অর্থনীতিবিদদের কাজ নয়; এটি নাগরিক, ভোটার, আন্দোলনকারী ও নীতিনির্ধারক—সবাই মিলে নেওয়ার ব্যাপার।

বাজার টিকে থাকবে। সমতা টিকিয়ে রাখার লড়াইটা কিন্তু এখনও আমাদের হাতে।


সূত্র

 

Share This Article
Journalist
Follow:
Investigative journalist and author Tuhin Sarwar covers human rights, the Rohingya crisis, climate change, and AI governance and accountability through data-driven journalism, field research, and evidence-based reporting.
Leave a Comment