একটি মুহূর্ত, যেখানে রাজনীতি থেমে গিয়েছিল

6 Min Read

খালেদা জিয়া: মৃত্যুর পরও যে মানবিক ঐক্যের ছবি বাংলাদেশ দেখল

বাংলাদেশের রাজনীতি সাধারণত বিভাজনের ভাষায় কথা বলে। ক্ষমতা ও বিরোধিতা মুখোমুখি, কণ্ঠে তিক্ততা, স্মৃতিতে সংঘাত। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, খালেদা জিয়ার জানাজার সেই মুহূর্ত সব চেনা বাস্তবতাকে থামিয়ে দিল। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায় একই কাতারে দাঁড়িয়ে আছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সামরিক ও বেসামরিক সদস্যরা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, কোনো স্লোগান নেই, কোনো দলীয় ব্যানার নেই শুধু নীরবতা ও প্রার্থনা।

যেমন প্রথম নজরে এই দৃশ্যটি শুধু জানাজার মুহূর্ত মনে হয়, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে এটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জাতিসত্তার একটি বিরল প্রতীক। খালেদা জিয়া শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি একাধিক রাজনৈতিক যুগের সাক্ষী সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতন্ত্র, তীব্র দলীয় বিভাজন এবং দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তাঁর জানাজার কাতারে যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা পাশাপাশি দাঁড়ান, এটি কোনো সমঝোতার ঘোষণা নয়। বরং এটি একটি নীরব স্বীকৃতি, যে মৃত্যু রাজনীতির চেয়েও বড়, এবং কিছু মুহূর্তে বিভাজন স্থগিত থাকে। এই দৃশ্য পাঠককে শেখায়, মানবতার মূল্য রাজনৈতিক পরিচয় থেকে অনেক উপরে। বিভাজনের চেয়ে মানুষের শ্রদ্ধা বড়।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্ক ও উত্তাপ স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু কাতারে সেই উত্তাপ দেখা যায়নি। যারা একে অপরের কঠোর সমালোচক, তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন পাশাপাশি। কেউ কারও দিকে আঙুল তুলছিল না, কেউ কারও দিকে তিক্ত চোখে তাকাচ্ছিল না। শুধু নীরব শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা। এই মুহূর্ত পাঠককে শেখায় যে শক্তি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে মানবিক উদারতা বজায় রাখা সম্ভব।

জানাজার মাঠে সাধারণ মানুষের কণ্ঠে বিস্ময় ও প্রশান্তি লক্ষ্য করা গেছে। একজন বলেন, “আমরা তো অভ্যস্ত সংঘাত দেখতে, কিন্তু আজ সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে। এই দৃশ্যটা আগে দেখিনি।” এখানেই এই ঘটনার মানবিক গুরুত্ব। রাজনীতি যেখানে বিভাজন তৈরি করে, শোক মানুষকে এক করে। পাঠক উপলব্ধি করতে পারে, মানুষের সেরাটা আসে সাময়িক হলেও বিভাজন ভুলে একত্রিত হলে। এটি মৌলিক মানবিক শিক্ষা—যেখানে মানুষ একে অপরের জন্য ভালো হতে পারে।

এক কাতারে দাঁড়ানো প্রতিপক্ষেরা

জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেশের ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার নেতারা ড. মুহাম্মদ ইউনুস, তারেক রহমান, ডা. শফিকুর রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মিয়া গোলাম পরওয়ার, নাহিদ ইসলামসহ আরও অনেকেই।

এই দৃশ্যটি পরিকল্পিত ঐক্যের ছবি নয়। বরং এটি ছিল পরিস্থিতির স্বাভাবিক ফল যেখানে মৃত্যু রাজনীতিকে সাময়িকভাবে নিস্তব্ধ করে দেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, যেখানে বিভাজন প্রায় স্থায়ী বাস্তবতা, সেখানে এমন এক কাতার প্রশ্ন তোলে—
আমরা কি সত্যিই কেবল বিভক্তই, নাকি প্রয়োজনে একসঙ্গে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও আমাদের আছে ?

সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল বাহিনীর উপস্থিতি। বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়ই রাজনৈতিক চশমায় দেখা হয়। কিন্তু সেই দিন বাহিনীর সদস্যরা দাঁড়িয়েছিলেন একজন মানুষের মৃত্যুতে নিরপেক্ষ ও মানবিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনে, রাষ্ট্রীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই। পাঠক শিখতে পারে, ক্ষমতা মানেই কর্তৃত্ব নয়; মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও ক্ষমতার নিদর্শন।

জানাজার মাঠে সাধারণ মানুষ ছিলেন রাজনৈতিক পার্থক্য ভুলে। কেউ ভোট দিয়ে ছিলেন, কেউ না। কেউ এসেছিলেন দায়িত্ববোধে, কেউ কৌতূহলে, কেউ কেবল শোক জানাতে। এই উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয় যে মানবিক অনুভূতি রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে শক্তিশালী।

বাংলাদেশের ইতিহাসও বহুবার দেখিয়েছে যে, যখন মানবিক বা জাতীয় সঙ্কট আসে, মানুষ একত্রিত হয়। যেমন ওসমান হাদির জানাজা (২০২৫), ২৪-এর ছাত্র আন্দোলন (৫ আগস্ট ২০২৪), ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে মানুষ পার্থক্য ভুলে একসাথে এসেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা ত্রাণ সংকটের সময়ও মানুষ রাজনৈতিক পরিচয় অগ্রাহ্য করে সহায়তা করেছে। এই জানাজার মুহূর্তও সেই ঐতিহ্যের অংশ, যেখানে রাজনৈতিক নেতারা, বাহিনী ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে মানবিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে।

বিশ্ব রাজনীতিতেও এমন দৃশ্য বিরল নয়। নেলসন ম্যান্ডেলার জানাজায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তি একত্র হয়েছিল, জাপানে রাষ্ট্রীয় শোকের সময় রাজনৈতিক বিরোধ স্থগিত থাকত। এই মুহূর্তগুলো স্থায়ী ঐক্য নয়, কিন্তু স্মৃতি ও প্রতীক হিসেবে কাজ করে। খালেদা জিয়ার জানাজার কাতারও সেই রকম।

রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু খালেদা জিয়ার জানাজার মুহূর্ত মানুষকে শেখায় যে মানুষ একত্রিত হতে পারে, শ্রদ্ধা ও মানবিকতার চেয়ে বিভাজন ছোট। পাঠক অনুধাবন করতে পারে: যদি এমন সূভাগ্য আমার জীবনে হতো, আমি হয়তো নিজেকে আরও ভালো মানুষ হিসেবে গড়তে পারতাম।

সম্ভবত রাজনীতি আবার তার চেনা পথে ফিরবে। বিতর্ক, সংঘাত, অবিশ্বাস থাকবে। কিন্তু প্রতীকগুলো স্মৃতিতে কাজ করে। খালেদা জিয়ার জানাজার কাতার মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ চাইলে এক হতে পারে নীরবতায় হলেও। এই দৃশ্য মানবিক ঐক্যের এক বিরল চিহ্ন, যা রাজনৈতিক দল নয়, বরং মানুষের উপর মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শিক্ষা দেয়।

খালেদা জিয়ার জানাজা এক মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতি ও মানুষের ঐক্য
খালেদা জিয়ার জানাজা এক মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতি ও মানুষের ঐক্য

তারেক রহমান: এক অসম্ভব মুহূর্ত

এই জানাজার আরেকটি গভীর প্রতীকি দিক ছিল তারেক রহমানের উপস্থিতি।
একসময় যাঁর কারাবন্দি জীবন, নির্বাসন এবং অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা ছিল তাঁর এমন উপস্থিতি একসময় কল্পনাতীত ছিল। কিন্তু সেদিন তিনি ছিলেন। আর তাঁর বক্তব্য ছিল না রাজনৈতিক ছিল মাত্র এক মিনিটের মানবিক উচ্চারণ।
মায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়া, দোয়ার আবেদন।

এই মুহূর্তটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। ক্ষমতার ভাষা নয়, প্রতিরোধের ভাষা নয় বরং একজন সন্তানের নত কণ্ঠ।

সেদিন রাজনীতি নীরব ছিল।

কারণ মৃত্যু সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট ১: লাভের গল্পের আড়ালে লোকসানের নথি, ৪০টি ট্রান্সপন্ডার অর্ধেকই খালি

লেখক:  তুহিন সারোয়ার।  বাংলাদেশি অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত লেখক, যিনি মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, শিশু শ্রম এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মাঠভিত্তিক ও তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিং করেন।

Share This Article
Journalist
Follow:
Tuhin Sarwar | Investigative Journalist Covering Human Rights | Tuhin Sarwar is an investigative journalist covering human rights, the Rohingya crisis, and climate change through verified field reporting, documented evidence, and fact-based analysis.
Leave a Comment