নিওলিবারেল বিশ্বে আয়বৈষম্য, শ্রম অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার
- কেন বাজারমুখী নীতি বৈষম্য বাড়ালো
- পিকেটি: পুঁজির আয় আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ে
- স্টিগলিট্জ: বাজারের উপর অতিরিক্ত ভরসা, জনকল্যাণের ক্ষতি
- মিলানোভিচ: পুঁজিবাদ এখন দুই রূপে, সমস্যা একই
- গিনি ও “labor share” – দুটো সহজ সূচক
- বাজার টিকে আছে, কিন্তু সমতা?
- কীভাবে ধনী আরও ধনী হলো
- স্ক্যান্ডিনেভিয়া: কল্যাণরাষ্ট্র ও বাজারের সমন্বয়
- চীন: Common Prosperity – সমতা নাকি নতুন নিয়ন্ত্রণের রূপ?
- লাতিন আমেরিকা: Pink Tide – অস্থায়ী স্বস্তি, নাকি স্থায়ী পরিবর্তন?
- অটোমেশন, AI এবং নতুন বৈষম্যের ঝুঁকি
- ভবিষ্যতের জন্য বামধারার নীতি সমাধান
- ১. ধনীদের প্রগতিশীল কর (Progressive Wealth & Income Tax)
- ২. ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI)
- ৩. ডিজিটাল ইউনিয়নাইজেশন ও গিগ শ্রমিকের অধিকার
- ৪. সবুজ ও ন্যায্য শিল্পনীতি (Eco-socialist Industrial Strategy)
- ৫. গ্লোবাল মিনিমাম কর্পোরেট ট্যাক্স
- শেষ কথা: বাজার থাকবে, সমতা থাকবে কি?
- উপসংহার: বাজার থাকবে, কিন্তু সমতা কি থাকবে?
গবেষণা: তুহিন সারোয়ার ।
চার দশক ধরে চলা নিওলিবারেল অর্থনীতি কীভাবে আয়বৈষম্য, শ্রম অধিকার সংকট ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করেছে—এ নিয়ে এই তথ্যভিত্তিক ফিচার। স্ক্যান্ডিনেভিয়া, চীন ও লাতিন আমেরিকার কেস স্টাডি, বিশ্বব্যাংক, OECD, ILO–এর ডেটা ও নীতিগত সমাধান মিলিয়ে এখানে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ধরা যাক, কোনো দেশে মোট অর্থনীতি অনেক বেড়েছে। GDP আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে, বড় শহরে নতুন নতুন হাইওয়ে, শপিং মল, টেক কোম্পানি গড়ে উঠেছে। সরকার বলছে, “অর্থনীতি ভালো, দেশ এগোচ্ছে।”
কিন্তু সাধারণ মানুষ কী দেখছে?
- বেতনের হিসাব প্রায় একই আছে, কিন্তু ঘরভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্যখরচ সবই বেড়েছে।
- চাকরি বদলেছে—স্থায়ী নিয়োগ কমেছে, বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক কাজ, গিগ প্ল্যাটফর্ম, আংশিক সময়ের কাজ।
- ধনীদের গাড়ি, বাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ—সবই চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
এই ছবিটা শুধু একটা দেশের নয়। গত প্রায় ৪০ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী যে নিওলিবারেল অর্থনীতি চালু ছিল—যার মূল কথা ছিল বাজার খুলে দাও, সরকারি খাত ছোট করো, পুঁজির চলাচল সহজ করো—তার ফল এখন পরিষ্কার:
- অনেক দেশে অর্থনীতি মোট হিসাবে বড় হয়েছে, কিন্তু সেই সম্পদের বড় অংশ জমেছে উপরের ১–১০% মানুষের হাতে।
- সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত, আয়ের তুলনায় খরচের চাপে আরও বেশি বেকায়দায় পড়েছে।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি ব্যবহার করি: গিনি সূচক (Gini Index)। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি সংখ্যা যা বলে কোনো দেশে আয়ের ভাগাভাগি কতটা সমান বা অসমান।
- মান ০ এর দিকে গেলে বোঝায় সবাই প্রায় সমান আয় পায়।
- মান ১ এর দিকে গেলে বোঝায় আয়ের প্রায় সবটাই কয়েকজনের হাতে।
বিশ্বব্যাংকের অফিসিয়াল ডেটা দেখালে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে অনেক দেশে গিনি সূচক উচ্চ পর্যায়ে আটকে আছে বা বেড়েছে।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা ধরা যাক। ফেডারেল রিজার্ভের (FRED) গিনি ডেটা দেখায়, ২০২২–২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসপোজেবল আয়ের গিনি সূচক প্রায় ০.৪১৭–০.৪১৮। শূন্যের কাছে গেলে সমতা, একের কাছে গেলে চরম বৈষম্য—এই স্কেলে ০.৪ এর ওপরে মানে পরিষ্কার উচ্চ বৈষম্য।
অর্থাৎ, বাজারমুখী নীতি দিয়ে অর্থনীতি বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই অর্থের ভাগাভাগি মোটেও সবার জন্য এক রকম নয়। এখান থেকেই আবার ফিরে আসছে বামপন্থী রাজনৈতিক ভাবনা—যার মূল কথা:
“সমাজের উন্নতি তখনই টেকসই, যখন আয়ের সুবিধা তুলনামূলকভাবে সবাই পায়, আর শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।”
কেন বাজারমুখী নীতি বৈষম্য বাড়ালো
নিওলিবারেল নীতির মূল তিনটি দিক ছিল:
- সরকারি খাত ছোট করা – বেসরকারি কোম্পানির হাতে বেশি দায়িত্ব দেওয়া।
- নিয়ন্ত্রণ কমানো (deregulation) – ব্যাংক, আর্থিক খাত, বড় কোম্পানির ওপর নিয়ম শিথিল করা।
- কর কমানো – বিশেষ করে উচ্চ আয় আর কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে “বিনিয়োগ বাড়ানোর” চেষ্টা।
তত্ত্ব ছিল, ধনীরা বিনিয়োগ করলে নতুন কর্মসংস্থান হবে, ফলে সবাই লাভবান হবে—এটাকে বলা হতো “trickle‑down” বা “ধন উপরে থেকে নিচে নামে” তত্ত্ব।
কিন্তু একের পর এক গবেষণা দেখাল, বাস্তবে এর বড় একটি অংশই ধনীদের পুঁজিতে যোগ হয়েছে, সাধারণ মানুষের আয় ততটা বাড়েনি।
পিকেটি: পুঁজির আয় আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ে
ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি তার বিখ্যাত বই Capital in the Twenty‑First Century‑এ দীর্ঘমেয়াদি ডেটা দিয়ে দেখিয়েছেন:
- পুঁজির ওপর গড় রিটার্ন (যেমন সুদ, মুনাফা, ভাড়া) অনেক সময় অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি গতিতে বাড়ে।
- যে পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে বেশি পুঁজি থাকে, তারা আরও দ্রুত ধনী হয়ে যায়।
- যারা শুধু শ্রম বিক্রি করে—মানে বেতনভোগী—তাদের আয় তুলনামূলকভাবে ধীরে বাড়ে।
ফলাফল খুব সহজ:
“বিনিয়োগের আয় যদি সাধারণ বেতনের তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ে, তবে সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই উপরের দিকে জমা হবে।”
স্টিগলিট্জ: বাজারের উপর অতিরিক্ত ভরসা, জনকল্যাণের ক্ষতি
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিট্জ People, Power, and Profits‑এ বলেন, বাজারকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখার নামে:
- বড় কর্পোরেশনগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে,
- কর ব্যবস্থা এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যেখানে ধনীদের প্রকৃত করহার কার্যত কম থেকেছে,
- আর জনকল্যাণমূলক ব্যয়—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা—অনেক জায়গায় কাটা পড়েছে।
তিনি সরাসরি লিখেছেন, এই নীতিগুলো গণতন্ত্রের ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, কারণ অর্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাব এখন অল্প কিছু মানুষের হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত।
মিলানোভিচ: পুঁজিবাদ এখন দুই রূপে, সমস্যা একই
বৈশ্বিক অসমতা নিয়ে কাজ করা অর্থনীতিবিদ ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ Capitalism, Alone‑এ বলেন, আজ পৃথিবীতে কার্যত একটাই ব্যবস্থা—ক্যাপিটালিজম। পার্থক্য হলো:
- পশ্চিমা দেশে – লিবারাল/মেরিটোক্র্যাটিক ক্যাপিটালিজম,
- চীনের মতো দেশে – রাজনৈতিক ক্যাপিটালিজম।
কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই এক জিনিস মিলছে: পুঁজির মালিকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, আর শ্রমের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
গিনি ও “labor share” – দুটো সহজ সূচক
বৈষম্য বোঝার জন্য আমরা দুটো বিষয় দেখি:
- Gini Coefficient – আগেই বলেছি, ০ মানে সমতা, ১ মানে চরম বৈষম্য। বিশ্বব্যাংকের ডেটা দেখায়, অনেক নিওলিবারেল অর্থনীতি–নির্ভর দেশে গিনি ০.৪ বা তার ওপরে।
- Labor Share of Income – মোট আয়ের কত অংশ যায় শ্রমিকদের কাছে, আর কত অংশ যায় পুঁজির মালিকদের কাছে। আইএলও‑এর ILOSTAT ডেটা দেখলে বোঝা যায়, অনেক দেশে গত কয়েক দশকে শ্রমের অংশ কমেছে।
এখানে বাস্তব জীবনের ছবি খুব সহজ:
ডেটা বলছে বৈষম্য বেড়েছে; বাস্তবে তার মানে হলো—উপরে কয়েকজনের গাড়ি, বাড়ি, বিনিয়োগ সবই বড় হয়েছে, আর নিচের মানুষের বাড়ি ভাড়ার দুশ্চিন্তা, স্বাস্থ্যখরচের চাপ একটুও কমেনি।
বাজার টিকে আছে, কিন্তু সমতা?
গত চার দশক ধরে অনেক দেশেই অর্থনীতির অঘোষিত মন্ত্র ছিল নিওলিবারেল নীতি: সরকারি খাত ছোট করা, নিয়ন্ত্রণ কমানো, কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো, পুঁজির চলাচল সহজ করা। প্রতিশ্রুতি ছিল, বাজার মুক্ত হলে প্রবৃদ্ধি হবে, সেই প্রবৃদ্ধির লাভ একসময় সবাইকে ছুঁয়ে যাবে।
বাস্তবে কী ঘটেছে? বড় শহরে নতুন ফ্লাইওভার, শপিং মল, টেক কোম্পানি তৈরি হয়েছে, শেয়ারবাজার বেড়েছে—কিন্তু একই সাথে অনেক দেশে দেখা গেছে বেতন প্রায় একই রকম, অথচ ভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্যখরচ দ্রুত বেড়েছে। স্থায়ী চাকরির বদলে বেড়েছে চুক্তিভিত্তিক ও গিগ‑কাজ। সাধারণ মানুষ অনুভব করছে: ধনীরা আরও ধনী, আর সাধারণরা আরও অতি সাধারণ।
এই অনুভূতি শুধু কথার কথা নয়, আন্তর্জাতিক ডেটাও একই ছবি দেখাচ্ছে। আয়বৈষম্য মাপার সবচেয়ে পরিচিত সূচক গিনি সূচক (Gini Coefficient)। মান ০ এর দিকে গেলে সমতা, ১ এর দিকে গেলে চরম বৈষম্য বোঝায়। বিশ্বব্যাংকের ডেটা দেখায়, অনেক দেশে এই গিনি মান দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ থেকে যাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরা যাক। ফেডারেল রিজার্ভের (FRED) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসপোজেবল আয়ের গিনি সূচক প্রায় ০.৪১৭–০.৪১৮—অর্থাৎ উচ্চ বৈষম্য। OECD‑এর আয় ও সম্পদ বৈষম্য রিপোর্ট দেখায়, বহু উন্নত দেশে শীর্ষ ১০% মানুষ মোট আয়ের এমন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা নিচের ৪০%‑এর সম্মিলিত আয়ের চেয়েও বেশি।
প্রশ্ন স্বাভাবিক: বাজার টিকে গেছে, প্রবৃদ্ধি এসেছে, কিন্তু আসল লাভ কারা পেল? কার হাতে জমেছে চার দশকের এই “বাজার বাঁচানোর” ফলাফল?
কীভাবে ধনী আরও ধনী হলো
ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি তার আলোচিত বই Capital in the Twenty‑First Century‑এ শত বছরের বেশি সময়ের আয় ও সম্পদের ডেটা বিশ্লেষণ করে বলেন: যখন পুঁজির গড় রিটার্ন (সুদ, মুনাফা, ভাড়া) দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়, তখন স্বাভাবিক ফল হলো যারা আগে থেকেই ধনী, তারা আরও দ্রুত ধনী হয়। যারা শুধু বেতন বা মজুরির ওপর নির্ভর করে, তারা এই গতির সাথে তাল মিলাতে পারে না। ফলে উপরের দিকের সম্পদের স্তর ক্রমেই মোটা হয়, নিচের স্তর পাতলা।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিট্জ People, Power, and Profits‑এ দেখিয়েছেন, নিওলিবারেল নীতির নামে আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল, বড় কর্পোরেশনের কর কমানো এবং শ্রমিকের অধিকার দুর্বল করা—সব মিলিয়ে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রকে অনেক জায়গায় সংকুচিত করেছে। এর ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তার খরচ ব্যক্তির কাঁধে বেশি পড়েছে, আর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীভূত হয়েছে অল্প কিছু এলিটের হাতে।
বৈশ্বিক অসমতা গবেষক ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ Capitalism, Alone‑এ বলেন, পৃথিবীতে এখন কার্যত একটাই সিস্টেম—ক্যাপিটালিজম; পার্থক্য শুধু এর রূপে: পশ্চিমে “লিবারাল‑মেরিটোক্র্যাটিক” আর চীনে “রাজনৈতিক পুঁজিবাদ”। কিন্তু দুই মডেলেই একটি মিল স্পষ্ট: পুঁজি‑মালিকদের ক্ষমতা বেড়েছে, সংগঠিত শ্রমের ক্ষমতা কমেছে।
অর্থাৎ ডেটা, থিওরি আর সাধারণ মানুষের জীবন—সব মিলিয়ে যে ছবি দাঁড়াচ্ছে, তা স্পষ্ট: নিওলিবারেল বাজার প্রবৃদ্ধি এনেছে, কিন্তু সেই লাভের বড় অংশ জমেছে উপরের দিকে। নিচের দিকে পৌঁছেছে সীমিত অংশ, আর তা দিয়েও অনেকের জন্য জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
তবে সব জায়গায় একই পথেই হাঁটা হয়নি। স্ক্যান্ডিনেভিয়া, চীন, লাতিন আমেরিকা—এই তিনটি ক্ষেত্রভিত্তিক উদাহরণ দেখায়, নিওলিবারেল গ্লোবাল ইকোনমির ভেতর থেকেও ভিন্ন ধরনের বামমুখী বা হাইব্রিড নীতি কীভাবে কাজ করছে—আবার কোথায় কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়া: কল্যাণরাষ্ট্র ও বাজারের সমন্বয়
নর্ডিক দেশগুলো—নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক—প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে যখন প্রশ্ন থাকে: উন্মুক্ত বাজার রেখে কি তুলনামূলক সমতা সম্ভব? এখানে রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি, ফ্রি ট্রেড, প্রযুক্তি‑নির্ভর প্রবৃদ্ধি; আবার একই সাথে আছে শক্তিশালী কল্যাণরাষ্ট্র ও শ্রমিক অধিকার।
OECD‑এর আয়বণ্টন ডেটা দেখায়, কর ও ভর্তুকির আগে নর্ডিক দেশগুলোর গিনি সূচক অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের মতোই। কিন্তু কর ও সামাজিক ট্রান্সফার প্রয়োগের পর তা নেমে আসে প্রায় ০.২৬–০.২৮ পর্যায়ে। অর্থাৎ বাজার যে বৈষম্য তৈরি করে, রাষ্ট্র কর ও কল্যাণমূলক ব্যয়ের মাধ্যমে তার বড় অংশ কমিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী গেস্তা এসপিং‑আনডারসেন The Three Worlds of Welfare Capitalism‑এ নর্ডিক মডেলের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন:
- স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পেনশন, বেকার ভাতা—এসব সুবিধা প্রায় সবার জন্য (ইউনিভার্সাল), শুধু গরিবদের জন্য নয়।
- শ্রমিক সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়ন শক্তিশালী; বেতন ও কাজের শর্ত যৌথভাবে নির্ধারিত হয়।
- করহার তুলনামূলক বেশি, কিন্তু নাগরিক জানে সেই করের বিনিময়ে নিরাপত্তা ও পরিষেবা পাচ্ছে।
ফলে এখানে “ধনীরা আরও ধনী” হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে মৌলিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বেকারত্বের সময়ে ভরসা—সবকিছু মিলিয়ে সমতার একটি ন্যূনতম মান বজায় থাকে। বাজার টিকে আছে, কিন্তু সমতাকেও সচেতনভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
চীন: Common Prosperity – সমতা নাকি নতুন নিয়ন্ত্রণের রূপ?
চীনের পথ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার থেকে আলাদা। পরিকল্পিত কমিউনিস্ট অর্থনীতি থেকে উঠে এসে দেশটি এখন রাজনৈতিক পুঁজিবাদ বা “সোশ্যালিস্ট মার্কেট” মডেলে দাঁড়িয়েছে। বাজার খুলেছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গভীরভাবে ঢুকেছে—আবার একই সাথে দল ও রাষ্ট্রের হাতে রয়ে গেছে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ।
এই মডেলের ভিতরে বেড়েছে আয়বৈষম্য। বিশ্বব্যাংকের গিনি ডেটা দেখায়, চীনের গিনি সূচক একসময় ০.৪ এর অনেক ওপরে ছিল; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা কমে এখন আনুমানিক ০.৩৭–০.৪০। এই বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যেই প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ঘোষণা করেছেন Common Prosperity কর্মসূচি।
এর অংশ হিসেবে:
- বড় টেক ও প্ল্যাটফর্ম কোম্পানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, জরিমানা ও নীতি‑সংকোচন চালানো হয়েছে।
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান খাতে ভর্তুকি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে।
- গ্রামীণ এলাকায় বিনিয়োগ ও দারিদ্র্য হ্রাস কর্মসূচি জোরদার হয়েছে।
চীন ডিজিটাল মুদ্রা e‑CNY ও বৃহৎ ডেটা‑ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করছে। এর ফলে আংশিকভাবে এমন এক সোশ্যালিস্ট মার্কেট হাইব্রিড তৈরি হয়েছে, যেখানে বাজারের প্রবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুনর্বণ্টন একসাথে চলছে।
তবে এই মডেল নিয়েও প্রশ্ন আছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও স্বচ্ছতার অভাব থাকলে কি এই পুনর্বণ্টন সত্যিকারের সমতা আনবে, নাকি শুধু ধনীদের কিছু ক্ষমতা কমিয়ে রাজনৈতিক এলিটের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করবে—এ নিয়ে বিতর্ক চলছেই। তবু অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে চীন দেখায়, নিওলিবারেল ফ্রি‑মার্কেট মডেল ছাড়াও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বিকল্প পথ বাস্তবে সম্ভব।
লাতিন আমেরিকা: Pink Tide – অস্থায়ী স্বস্তি, নাকি স্থায়ী পরিবর্তন?
লাতিন আমেরিকা বহুদিন ধরেই বিশ্বে আয়বৈষম্যের দিক থেকে শীর্ষে। বিশ্বব্যাংকের Gini ডেটা অনুযায়ী, অনেক দেশেই গিনি সূচক ০.৪৫–০.৫০ এর ওপরে।
২০০০‑এর দশকের শুরুতে প্রথম “Pink Tide” ঢেউয়ে ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডরসহ বহু দেশে বাম বা মধ্য‑বাম সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা চালু করে:
- শর্তসাপেক্ষ নগদস্থানান্তর প্রোগ্রাম (যেমন ব্রাজিলের Bolsa Família),
- সামাজিক খাতে বেশি ব্যয়,
- কিছু খাতে জাতীয়করণ।
ফলে দারিদ্র্য অনেক কমে, নিচের দিকের মানুষের হাতে কিছুটা অর্থ যায়। কিন্তু এই সাফল্যের বড় অংশই ভর করেছিল তেল ও কমোডিটি আয়ের ওপর। যখন তেলের দাম পড়ে যায় ও বৈশ্বিক বাজারে ধাক্কা লাগে, তখন এই নীতি অনেক জায়গায় টেকেনি।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী কেনেথ রবার্টস Changing Course in Latin America‑এ দেখিয়েছেন, বামমুখী এই ঢেউ নিওলিবারেল নীতিকে চ্যালেঞ্জ করলেও করব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক কাঠামো যথেষ্ট বদলাতে না পারায় অর্জন ভঙ্গুর থেকে গেছে।
২০২০‑এর দশকে আবার দেখা যাচ্ছে Pink Tide 2.0—ব্রাজিল, চিলে, কলম্বিয়া, মেক্সিকোতে নতুন প্রগ্রেসিভ সরকার। তারা আবারও চেষ্টা করছে বেশি কর, বেশি সামাজিক ব্যয় ও সবুজ শিল্পনীতির মাধ্যমে বৈষম্য কমানোর। কিছু সূচক ইতিবাচক, কিন্তু এখনো আঞ্চলিক গিনি মান উচ্চ, আর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান অনেক কিছুই অনিশ্চিত করে রাখছে। লাতিন আমেরিকা তাই শেখায়: বামধারার পুনর্বণ্টন নীতি দরকার, কিন্তু শুধু ক্যাশ ট্রান্সফারে থেমে গেলে স্থায়ী সমতা আসে না; দরকার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন।
অটোমেশন, AI এবং নতুন বৈষম্যের ঝুঁকি
নিওলিবারেল যুগের ওপর দাঁড়িয়েই পৃথিবী ঢুকছে আরেক ঝড়ের মধ্যে—অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে। আগে যে কাজ পাঁচজন করত, এখন তার বড় অংশ করতে পারে একটি রোবট বা অ্যালগরিদম। কোম্পানির উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা বাড়ছে, কিন্তু সেই অতিরিক্ত লাভের কতটা যাচ্ছে শ্রমিকের পকেটে, আর কতটা যাচ্ছে প্রযুক্তি ও পুঁজি‑মালিকদের কাছে?
আইএলও‑এর (ILOSTAT) মজুরি ও কর্মসংস্থান ডেটা এবং বিশ্বব্যাংকের Jobs & Development প্ল্যাটফর্ম‑এর বিশ্লেষণ দেখায়, আগামী দশকে অনেক দেশে রুটিন কাজের বড় অংশ অটোমেশনের ঝুঁকিতে থাকবে।
এখানে “টেকনোলজিকাল রেন্ট” ধারণাটা গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ভাষায়, মেশিন বা সফটওয়্যার দিয়ে কাজ করিয়ে যে বাড়তি লাভ হয়, তার বেশির ভাগ যদি শ্রমিকের আয় বাড়ানোর বদলে শুধু মালিকের মুনাফা বাড়ায়, সেটাই টেকনোলজিকাল রেন্ট। এই রেন্ট যদি সমাজে কর ও পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে যথেষ্ট ফিরিয়ে না আনা হয়, তবে নিওলিবারেল যুগে তৈরি হওয়া বৈষম্য আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভবিষ্যতের জন্য বামধারার নীতি সমাধান
এই তিনটি অঞ্চলের অভিজ্ঞতা (স্ক্যান্ডিনেভিয়া, চীন, লাতিন আমেরিকা) আর অটোমেশন‑AI–এর চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে আজ বৈশ্বিক আলোচনায় কয়েকটি বামমুখী নীতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
১. ধনীদের প্রগতিশীল কর (Progressive Wealth & Income Tax)
ধনীদের ওপর বেশি হারে কর, যাতে সেই অর্থ দিয়ে সবার জন্য সেবা দেওয়া যায়—এটা বামধারার পুরোনো কিন্তু এখনও কার্যকর ধারণা।
পিকেটি তার বইতে (লিংক) প্রস্তাব করেছেন আন্তর্জাতিক সমন্বিত ধনকর, বিশেষ করে শীর্ষ ১–৫% ধনীর ওপর। এই ধরনের কর থেকে আসা অর্থ দিয়ে:
- স্বাস্থ্যখাত,
- শিক্ষা,
- সামাজিক নিরাপত্তা,
- সবুজ জ্বালানির মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা যায়।
২. ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI)
কাজ থাকুক বা না থাকুক, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ন্যূনতম আয়—এটাই UBI ধারণা। অটোমেশনের যুগে এটা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিভিন্ন দেশ ও শহরে ছোট পরিসরে UBI ট্রায়াল চলছে। অর্থের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে:
- কার্বন ট্যাক্স,
- প্রাকৃতিক সম্পদের রেন্ট,
- বা অটোমেশন/রোবট কর।
ভাবনাটা পরিষ্কার:
“যদি সমাজের মোট উৎপাদনশীলতা বাড়ে, তাহলে তার একটা ন্যূনতম অংশ সবাই পাবে—শুধু যারা চাকরি পেয়েছে, তারাই নয়।”
৩. ডিজিটাল ইউনিয়নাইজেশন ও গিগ শ্রমিকের অধিকার
উবার, ফুড ডেলিভারি, অনলাইন ফ্রিল্যান্স—এই সব প্ল্যাটফর্মে কাজ করা মানুষদের সাধারণত স্বনিয়োজিত বলা হয়। ফলে তারা প্রায়ই:
- ন্যূনতম মজুরি,
- পেনশন,
- বেকার ভাতা,
- বা শ্রম আইনের সুরক্ষা—কোনোটাই পায় না।
এখানেই আসে digital unionization। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্ল্যাটফর্ম‑শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য Platform Work Directive নামে একটি আইনগত উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে অনেক প্ল্যাটফর্ম কর্মীকে কর্মচারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব আছে।
বামধারার দৃষ্টিতে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ:
“শুধু কারখানার শ্রমিক নয়, অ্যাপের পেছনের শ্রমিকও শ্রমিক—তাদেরও সংগঠিত হওয়া ও অধিকার পাওয়া দরকার।”
৪. সবুজ ও ন্যায্য শিল্পনীতি (Eco-socialist Industrial Strategy)
জলবায়ু সংকটের যুগে সমতা আর পরিবেশকে আলাদা করে দেখা যায় না। বামধারার অনেক দল ও আন্দোলন এখন ইকো‑সোশ্যালিস্ট কৌশল প্রস্তাব করছে, যেমন:
- জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকি ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া,
- সেই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা,
- শ্রমিক মালিকানাধীন বা কমিউনিটি‑নিয়ন্ত্রিত সবুজ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া,
- পুরনো শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য “Just Transition”—অর্থাৎ ন্যায্য রূপান্তর—নিশ্চিত করা।
এভাবে জলবায়ু নীতি আর শ্রম অধিকারকে একসঙ্গে দেখা যায়।
৫. গ্লোবাল মিনিমাম কর্পোরেট ট্যাক্স
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রায়ই মুনাফা “করস্বর্গ” বা tax haven–এ সরিয়ে কম কর দেয়। এর ফলে দেশগুলোর কর আয় কমে, সামাজিক খাতে খরচের সক্ষমতাও কমে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় OECD/G20‑এর BEPS ইনক্লুসিভ ফ্রেমওয়ার্ক একটি ১৫% গ্লোবাল মিনিমাম কর্পোরেট ট্যাক্স প্রস্তাব করেছে। অনেক বামধারার অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সময়ের সঙ্গে এই হার আরও বাড়িয়ে ২০–২৫% করা দরকার, যাতে দেশগুলোর একে অন্যের সঙ্গে কর কমিয়ে প্রতিযোগিতায় নামতে না হয়।
এই নীতিগুলোর মূল কথা একটিই:
“গ্লোবালাইজড বাজারে কাজ করুক, কিন্তু কোম্পানিগুলো যেখানে ব্যবসা করে, সেখানকার সমাজের প্রতি তাদের ন্যায্য দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।”
শেষ কথা: বাজার থাকবে, সমতা থাকবে কি?
চার দশকের নিওলিবারেল অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, বাজার খুলে দিলে অর্থনীতি বড় হয়, কিন্তু সমতা নিজে নিজে আসে না। ডেটা বলছে, যেখানে কল্যাণরাষ্ট্র ও পুনর্বণ্টন দুর্বল, সেখানে আয়বৈষম্য উচ্চ; যেখানে রাজনৈতিকভাবে সমতা অগ্রাধিকার পেয়েছে—স্ক্যান্ডিনেভিয়া, আংশিকভাবে চীনের Common Prosperity, লাতিন আমেরিকার কিছু নীতি—সেখানে অন্তত কিছু মাত্রায় বৈষম্য কমানো গেছে।
অটোমেশন, AI ও জলবায়ু সংকট–নির্ভর ভবিষ্যতে প্রশ্নটা আরও তীব্র হবে: বাজার টিকে থাকবে, কিন্তু সমতা আর শ্রমের মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে আমরা কী করব?
উত্তর একেবারে পরিষ্কার নয়, কিন্তু দিকনির্দেশনা পরিষ্কার: প্রগতিশীল কর, কল্যাণরাষ্ট্র, শ্রমিকের সংগঠন, গিগ‑ওয়ার্কের নতুন অধিকার, সবুজ ও ন্যায্য শিল্পনীতি, এবং গ্লোবাল কর ন্যায়বিচার—এসব ছাড়া সমতা বাঁচানো কঠিন। সিদ্ধান্ত এখন রাজনৈতিক সমাজের—আমরা কি নিওলিবারেল বাজারকে আরও কিছু দশক একা চালাতে দেব, নাকি তাকে বাধ্য করব মানুষের সেবা করার জন্য কাজ করতে?
উপসংহার: বাজার থাকবে, কিন্তু সমতা কি থাকবে?
গত চার দশকের নিওলিবারেল যুগ আমাদের শিখিয়েছে, বাজার খুলে দিলে অর্থনীতি বড় হয়, কিন্তু সমতা আর নিরাপত্তা নিজে নিজে আসে না।
ডেটা বলছে:
- যেখানে করব্যবস্থা ও কল্যাণরাষ্ট্র দুর্বল, সেখানে গিনি সূচক উচ্চ থাকে, শ্রমের অংশ কমে।
- যেখানে শক্তিশালী পুনর্বণ্টন ও শ্রমিকের অধিকার আছে—যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়া—সেখানে বৈষম্য তুলনামূলক কম।
- চীন ও লাতিন আমেরিকা দেখায়, রাজনৈতিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক গঠন ভিন্ন হলেও বামধারার নীতি প্রয়োগের চেষ্টা আছে—কারও সাফল্য বেশি, কারও কম, কিন্তু প্রশ্নটা সবার জন্যই একই: কতটা সমতা চাই, আর কতটা অন্যায় মেনে নেবো?
অটোমেশন, AI, জলবায়ু সংকট, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে সামনে যে দশক আসছে, তা সহজ হবে না। বাজার সম্ভবত টিকে থাকবে—কারণ পুঁজিবাদ এখন বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই প্রভাবশালী।
কিন্তু সমতা, শ্রমের মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায় কি টিকে থাকবে—এটা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক হবে না।
সোজা কথায়:
“সমতা টিকিয়ে রাখতে চাইলে সেটাকে নীতির কেন্দ্রে বসাতে হবে—বাজারের অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নয়, বরং উন্নতির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে।”
বামধারার নীতি, ডেটা‑ভিত্তিক পুনর্বণ্টন, শ্রম অধিকার, সবুজ শিল্পনীতি—এসব নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে নতুন আলোচনা চলছে, তা তাই কোনো পুরোনো মতাদর্শের পুনরাবৃত্তি নয়। এটা হলো এমন এক ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা, যেখানে প্রযুক্তি ও বাজার মানুষকে পিছনে না ফেলে, সবার জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তা, সুযোগ আর মর্যাদা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
এই পথ কঠিন, কিন্তু স্ক্যান্ডিনেভিয়া, চীন ও লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা দেখায়—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আর সামাজিক চাপ একসঙ্গে থাকে, তাহলে বাজারমুখী বিশ্বেও সমতার লড়াই জিতে নেওয়া অসম্ভব নয়।
Piketty, T. (2014). Capital in the Twenty‑First Century. Belknap Press. https://doi.org/10.4159/9780674369542
Stiglitz, J. E. (2019). People, Power, and Profits: Progressive Capitalism for an Age of Discontent. W.W. Norton & Company. https://wwnorton.com/books/9781324004219
Milanovic, B. (2023). Capitalism, Alone: The Future of the System That Rules the World. Harvard University Press. https://www.hup.harvard.edu
Harvey, D. (2005). A Brief History of Neoliberalism. Oxford University Press. https://doi.org/10.1093/0199283267.001.0001
Esping‑Andersen, G. (1990). The Three Worlds of Welfare Capitalism. Princeton University Press. https://press.princeton.edu/books/paperback/9780691028576/the-three-worlds-of-welfare-capitalism
Roberts, K. M. (2015). Changing Course in Latin America: Party Systems in the Neoliberal Era. Cambridge University Press. https://doi.org/10.1017/CBO9781139174138
OECD (2024). Society at a Glance 2024 – Income and Wealth Inequalities. OECD iLibrary. https://www.oecd.org/en/publications/society-at-a-glance-2024_918d8db3-en/full-report/income-and-wealth-inequalities_7ac4178f.html
OECD. Income Distribution Database. https://www.oecd.org/social/income-distribution-database.htm
World Bank (2024). World Development Indicators: Gini Index. https://data.worldbank.org/indicator/SI.POV.GINI
World Bank. Latin America and Caribbean – Gini index. https://data.worldbank.org/indicator/SI.POV.GINI?locations=ZJ
World Bank. China – Gini index. https://data.worldbank.org/indicator/SI.POV.GINI?locations=CN
Federal Reserve Bank of St. Louis (FRED) (2025). U.S. Income Inequality Gini Index (Disposable Income). https://fred.stlouisfed.org/series/SIPOVGINIUSA
ILOSTAT (2025). Wages and income data. https://ilostat.ilo.org/topics/wages/
World Bank. Jobs and Development. https://www.worldbank.org/en/topic/jobsanddevelopment
OECD/G20. Inclusive Framework on BEPS and Global Minimum Tax. https://www.oecd.org/tax/beps/inclusive-framework-on-beps.htm
European Commission. Platform Work Initiative (Platform Work Directive). https://ec.europa.eu/commission/presscorner/detail/en/ip_21_6605
Stanford Basic Income Lab (UBI resources). https://basicincome.stanford.edu




