spot_imgspot_img

নব্য-উদারপন্থী বিশ্বে আয়বৈষম্য: চার দশকে যেভাবে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন

নিওলিবারেল বিশ্বে বামপন্থী ধারণা: বাজার টিকে থাকলেও কি সমতা টিকে থাকবে ?

লেখক: তুহিন সারোয়ার – ঢাকা 
তদন্তমূলক সাংবাদিক ও গবেষক
ডিপার্টমেন্ট অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যান্ড রিসার্চ, দ্য টুডে মিডিয়া এজেন্সি ও আর্টিকেল ইনসাইট, বাংলাদেশ
ইমেইল: info@tuhinsarwar.com

ORCID: ID : 0009-0005-1651-5193  তারিখ: ২৪ জুন ২০২৬ ।

নিচে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকেন কারখানার শ্রমিক, অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি কর্মী, নির্মাণশ্রমিক, রাইডশেয়ার চালক, অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষ। তাদের কাজ আছে, কিন্তু অনেকের চাকরির নিশ্চয়তা নেই; আয় আছে, কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা নেই; শহর বড় হচ্ছে, কিন্তু মাস শেষে হিসাব মেলানো কঠিন হচ্ছে।

গত চার দশকে এই প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে নিওলিবারেল অর্থনীতি একটি নীতিগত ধারা, যা বাজারকে বেশি স্বাধীনতা, রাষ্ট্রকে অপেক্ষাকৃত ছোট ভূমিকা, কর্পোরেট কর কমানো, বেসরকারিকরণ, আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং শ্রমবাজারকে “নমনীয়” করার ওপর জোর দিয়েছে। এর মূল প্রতিশ্রুতি ছিল: বাজার খুলে দিলে বিনিয়োগ বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান হবে, আর প্রবৃদ্ধির সুফল ধীরে ধীরে সমাজের নিচের স্তরেও পৌঁছাবে।

কিন্তু বৈশ্বিক ডেটা বলছে, সেই প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। World Inequality Report 2022 অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সম্পদের ৭৬% শীর্ষ ১০% মানুষের হাতে, আর নিচের ৫০% মানুষের হাতে মাত্র ২%। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক আয়ের ৫২% পায় শীর্ষ ১০%, আর নিচের ৫০% পায় মাত্র ৮%। অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতি বড় হলেও তার মালিকানা ও আয়বণ্টন গভীরভাবে অসম।

বাজারমুখী চার দশক: অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু কার জন্য?

গত প্রায় চার দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতির মূল নীতিমালা হিসেবে কাজ করেছে এক ধরনের দর্শন—নিওলিবারেল অর্থনীতি। এই ধারার মূল কথা ছিল খুব সরল:

  • সরকারি খাত ছোট করো,
  • নিয়ন্ত্রণ (regulation) কমাও,
  • করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াও,
  • পুঁজির চলাচল সহজ করো,
  • আর বাকিটা বাজার নিজে নিজে সামলে নেবে।

এই বিশ্বাস থেকে নীতি নির্ধারকেরা ভেবেছিলেন—বাজার যত বেশি মুক্ত হবে, তত বেশি প্রবৃদ্ধি আসবে, আর সেই প্রবৃিদ্ধর লাভ একসময় সবার ঘরেও পৌঁছাবে। প্রশ্ন হলো, বাস্তবে কি তাই হয়েছে?

ম্যাক্রো সংখ্যার দিকে তাকালে চিত্র খুব খারাপও নয়। অনেক দেশে গত কয়েক দশকে GDP কয়েক গুণ বেড়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে, শেয়ারবাজার ফুলে উঠেছে, বড় শহরে নতুন ব্যবসা-কেন্দ্র, টেক হাব, ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্ট গড়ে উঠেছে।

কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে এই পরিবর্তন কতটা প্রতিফলিত হয়েছে?

বহু দেশে দেখা গেছে—

  • মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব বেতন প্রায় স্থির থেকে গেছে,
  • বাসা ভাড়া, খাবার, স্বাস্থ্যখরচ, শিক্ষা—সবই বেতনের চেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে,
  • স্থায়ী চাকরির জায়গা নিয়েছে চুক্তিভিত্তিক কাজ, আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্ম ও গিগ‑ইকোনমি

ফলে এক বাক্যে অনেকের অনুভূতি দাঁড়িয়েছে:

“ধনীরা আরও ধনী হয়েছে, আর সাধারণ মানুষের জীবনে বেড়েছে অনিশ্চয়তা ও চাপ।”

এই অনুভূতিটা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, আন্তর্জাতিক ডেটাও তা সমর্থন করছে।

গিনি সূচক: সংখ্যায় ধরা পড়া বৈষম্য

আয়বৈষম্য বোঝার জন্য সবচেয়ে পরিচিত সূচক হলো গিনি সূচক (Gini Coefficient)। এর মান ০ হলে আয়ের সম্পূর্ণ সমতা, আর ১ এর দিকে গেলে বোঝায় আয়ের প্রায় সবটাই কয়েকজনের হাতে জমে আছে।

বিশ্বব্যাংকের অফিসিয়াল ডেটা দেখায়, নিওলিবারেল রূপরেখা অনুসরণ করা বহু দেশে গিনি সূচক দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মানে আটকে আছে, কোথাও কোথাও আরও বেড়েছে।

উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরা যায়। ফেডারেল রিজার্ভের (FRED) হিসাব অনুযায়ী, ২০২২–২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসপোজেবল আয়ের গিনি সূচক প্রায় ০.৪১৭–০.৪১৮। অর্থনীতির ভাষায় ০.৪ এর ওপরে মানে উচ্চ আয়বৈষম্য।

অন্যদিকে, OECD‑এর আয় ও সম্পদ বৈষম্য বিশ্লেষণ দেখায়, অনেক উন্নত দেশে শীর্ষ ১০% মানুষ মোট আয়ের এমন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা নিচের ৪০%‑এর সম্মিলিত আয়ের চেয়েও বেশি।

ডেটা যা বলছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনেও দৃশ্যমান: বাজার বেঁচে আছে, প্রবৃদ্ধি এসেছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুবিধা সমানভাবে বিতরণ হয়নি

কীভাবে নিওলিবারেল কাঠামো ধনীদের পক্ষে ঝুঁকে গেল

ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি তার বহুল আলোচিত গবেষণায় দেখিয়েছেন, কেন পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সম্পদ স্বাভাবিকভাবেই উপর দিকে জমতে থাকে। Capital in the Twenty‑First Century‑এ তিনি দীর্ঘমেয়াদি কর ও আয়ের ডেটা বিশ্লেষণ করে বলেন, যখন পুঁজির গড় রিটার্ন (r)—মানে সুদ, মুনাফা, ভাড়া—দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হারকে (g) ছাড়িয়ে যায়, তখন সম্পদ স্বাভাবিকভাবে আগেই যাদের হাতে আছে, তাদের দিকেই দ্রুত সরে যেতে থাকে।

যারা আগে থেকেই শেয়ার, জমি, ব্যবসা ইত্যাদির মালিক, তাদের সম্পদ দ্রুত বাড়ে। যারা শুধুমাত্র শ্রম বিক্রি করে—অর্থাৎ বেতন বা মজুরির ওপর নির্ভর করে—তারা এই গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। ফলাফল: শীর্ষ ধনী গোষ্ঠী আরও ধনী হয়, আর নিচের দিকের মানুষের অংশ তুলনামূলকভাবে ছোট হতে থাকে

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিট্‌জ People, Power, and Profits‑এ দেখিয়েছেন, শুধু বাজারের গাণিতিক হিসাবই নয়, নীতিগত সিদ্ধান্তও এ বৈষম্য বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, নিওলিবারেল নীতির নামে—

  • আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়েছে,
  • বড় কর্পোরেশনের ও ধনীদের জন্য করহার কমানো হয়েছে,
  • অনেক ক্ষেত্রে কল্যাণমূলক ব্যয় সীমিত হয়েছে,
  • এবং শ্রমিক সংগঠন ও ইউনিয়ন দুর্বল হয়েছে।

ফলে, পুঁজির মালিকদের দরকষাকষি ক্ষমতা বেড়েছে, আর শ্রমিকদের ক্ষমতা কমেছে। অন্যদিকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের কাঠামো অনেক জায়গায় সংকুচিত হয়েছে। এর যৌথ ফলাফল হলো—বাজার থেকে আসা বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে সেটাকে আরও শক্তিশালী করে তোলা

বৈশ্বিক অসমতা বিষয়ক গবেষক ব্রাঙ্কো মিলানোভিচ Capitalism, Alone‑এ বলেন, আজ কার্যত সমগ্র বিশ্বে একটাই ব্যবস্থা—ক্যাপিটালিজম—চলে, যদিও তার রূপ দুই ধরনের:

  • পশ্চিমা দেশে লিবারাল‑মেরিটোক্র্যাটিক ক্যাপিটালিজম,
  • আর চীনের মতো দেশে রাজনৈতিক পুঁজিবাদ (political capitalism)

দুই সিস্টেমের রাজনৈতিক কাঠামো আলাদা, কিন্তু একটি জায়গায় তারা মিলে যায়: পুঁজি‑মালিকদের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর শ্রমিকদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হচ্ছে

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠে—নিওলিবারেল কাঠামোর ভেতর থেকে কি বামধারার নীতি ধারণা এখনো আয়বৈষম্য কমাতে, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাস্তব কোনো অবদান রাখতে পারে? এর উত্তর খোঁজার জন্য আমরা তিনটি কেস স্টাডি দেখে নিতে পারি: স্ক্যান্ডিনেভিয়া, চীন, ও লাতিন আমেরিকা

নর্ডিক মডেল: বাজার থাকবে, কিন্তু সমতাও থাকবে

নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক—এই দেশগুলো একই সঙ্গে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও শক্তিশালী কল্যাণরাষ্ট্রের উদাহরণ হিসেবে বিশ্বজুড়ে আলোচিত। এখানে আছে:

  • বৈশ্বিক মানের বহুজাতিক কোম্পানি,
  • উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন,
  • এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গভীর অংশগ্রহণ।

কিন্তু একই সাথে রয়েছে—

  • সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা,
  • প্রায় ফ্রি উচ্চশিক্ষা,
  • মজবুত বেকার ভাতা ও পেনশন ব্যবস্থা,
  • আর শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন ও ইউনিয়ন

OECD‑এর আয়বণ্টন ডেটা দেখায়, কর ও সামাজিক ট্রান্সফারের আগে নর্ডিক দেশগুলোর গিনি সূচক অন্য উন্নত দেশের কাছাকাছি। কিন্তু কর, ভর্তুকি ও কল্যাণমূলক ব্যয়ের পর সেই মান নেমে আসে প্রায় ০.২৬–০.২৮‑এ।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী গেস্তা এসপিং‑আনডারসেন তার বই The Three Worlds of Welfare Capitalism‑এ নর্ডিক মডেলকে “সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক” রেজিম বলে চিহ্নিত করেছেন। এই রেজিমের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো:

  • কল্যাণ সেবা (healthcare, education, pension, unemployment benefit) প্রায় সবার জন্য উন্মুক্ত, শুধু গরিবদের জন্য নয়;
  • শ্রমিক সংগঠন শক্তিশালী, এবং বেতন ও কাজের শর্ত নিয়ে যৌথ দরকষাকষি (collective bargaining) হয়;
  • প্রগতিশীল করব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চ আয়ের ওপর বেশি কর নেওয়া হয়।

ফলে বাজারের সৃষ্টি করা বৈষম্যকে রাষ্ট্র সচেতনভাবে কমিয়ে আনে। এভাবে আয়ের বড় অংশ শীর্ষে জমে গেলেও নিচের ও মাঝের স্তরের জীবনমানকে একটি শক্ত সামাজিক মেঝে (social floor) রক্ষা করে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো: নর্ডিক মডেল দেখায় যে বাজারমুখী অর্থনীতি ও তুলনামূলক সমতা—দুটো একসাথে থাকা তাত্ত্বিক কল্পনা নয়, বাস্তব নীতির ফলাফল

চীনের Common Prosperity: হাইব্রিড মডেলের জটিলতা

স্ক্যান্ডিনেভিয়ার থেকে একেবারেই ভিন্ন একটি পথ নিয়েছে চীন। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে সরে এসে চীন এক ধরনের “সোশ্যালিস্ট মার্কেট ইকোনমি” গড়ে তুলেছে—যেখানে বাজার ও রাষ্ট্র দুইই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাজার খুলে দেওয়ার ফলে চীন গত কয়েক দশকে বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে তুলেছে। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের গিনি ডেটা দেখায়, ১৯৯০‑এর দশক ও ২০০০‑এর দশকে চীনের গিনি সূচক দ্রুত বেড়ে ০.৪ এর ওপরে চলে যায়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা কমে এখন তা আনুমানিক ০.৩৭–০.৪০

এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং চালু করেন “Common Prosperity” স্লোগান—যার লক্ষ্য হলো অতিরিক্ত ধনী‑গরিব ফাঁক কমানো ও “অসংযত পুঁজির বিস্তার” নিয়ন্ত্রণ করা। এর অংশ হিসেবে:

  • বড় প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম কোম্পানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে;
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান খাতে সরকারি হস্তক্ষেপ ও ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে;
  • গ্রামীণ উন্নয়ন ও দারিদ্র্যহ্রাস কর্মসূচিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

চীনের বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামো ও ডিজিটাল ইয়ুয়ান (e‑CNY) পাইলট প্রোগ্রাম রাষ্ট্রকে লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন এক ধরনের “Socialist Market Hybrid” তৈরি করছে—যেখানে বাজার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু একই সাথে রাষ্ট্র অতিরিক্ত বৈষম্য কমানোর জন্য সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে।

তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মডেলকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যম, সিভিল সোসাইটি—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন: জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে, “Common Prosperity” প্রকৃত অর্থে সমতা আনবে, নাকি কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করবে?

শুধু অর্থনৈতিক ফলাফল দিয়ে বিচার করলে—চীনের মডেল নিওলিবারেল মুক্তবাজারের তুলনায় বেশি পুনর্বণ্টনমূলক, তবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমতা স্তরে পৌঁছায়নি। তবু এটি দেখায়, রাষ্ট্র চাইলে নিওলিবারেল প্রবাহের বিপরীতে গিয়ে বামধারার কিছু নীতি ধারণা প্রয়োগ করতে পারে

লাতিন আমেরিকার Pink Tide: দ্রুত সাফল্য, কিন্তু ভঙ্গুর ভিত্তি

লাতিন আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বে সবচেয়ে বৈষম্যমূলক অঞ্চলগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বহু দেশেই গিনি সূচক এখনও ০.৪৫–০.৫০ এর ওপরে।

২০০০‑এর দশকের শুরুতে প্রথম “Pink Tide” ঢেউয়ে ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডরসহ অনেক দেশে বাম বা মধ্য‑বাম সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা:

  • শর্তসাপেক্ষ নগদ স্থানান্তর (conditional cash transfer) প্রোগ্রাম চালু করে—যেমন ব্রাজিলের Bolsa Família;
  • সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়ায়;
  • কখনো কখনো কিছু খাতে জাতীয়করণও করে।

ফলে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার নগদ সহায়তা ও ভর্তুকির মাধ্যমে কিছুটা নিরাপত্তা পায়।

কিন্তু এই সাফল্যের বড় অংশই নির্ভর করেছিল উচ্চ পণ্যমূল্য—বিশেষ করে তেল, খনিজ ও কৃষিপণ্য—এর ওপর। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পড়ে যায়, কমোডিটি সংকট দেখা দেয়, তখন বাজেট ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে অনেক দেশের বাম সরকার চাপের মুখে পড়ে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী কেনেথ রবার্টস Changing Course in Latin America: Party Systems in the Neoliberal Era‑এ দেখিয়েছেন, নিওলিবারেল নীতির বিকল্প হিসেবে আসা এই পুনর্বণ্টনমূলক পপুলিজম—যদিও স্বল্পমেয়াদে দরিদ্র মানুষের জীবনে স্বস্তি এনেছে—দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারেনি, কারণ করব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক ডাইভার্সিফিকেশন যথেষ্ট শক্ত ছিল না।

বর্তমানে আবার Pink Tide 2.0 হিসেবে ব্রাজিল, চিলে, কলম্বিয়া, মেক্সিকোসহ কয়েকটি দেশে প্রগ্রেসিভ সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তারা আবারও সামাজিক ব্যয়, সবুজ শিল্পনীতি ও রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করছে। কিছু সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও, উচ্চ আয়বৈষম্য, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক মেরুকরণ মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর।

লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা তাই দেখায়: শুধু নগদ সহায়তা ও সামাজিক ব্যয় দিয়ে দ্রুত দারিদ্র্য কমানো সম্ভব হলেও, স্থায়ী সমতা আনতে হলে গভীর কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন—বিশেষ করে করব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ডাইভার্সিফিকেশন ও প্রতিষ্ঠান শক্ত করার ক্ষেত্রে।

অটোমেশন ও AI: সমতার নতুন পরীক্ষাক্ষেত্র

নিওলিবারেল যুগের ওপর দাঁড়িয়েই বিশ্ব এখন ঢুকছে আরেকটি পরিবর্তনের মুখে—অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে

আগে যে কাজ কারখানায়, অফিসে, ব্যাংকে, এমনকি সংবাদকক্ষেও মানুষ করতো, তার অনেকটাই এখন মেশিন, সফটওয়্যার ও অ্যালগরিদমের হাতে যাচ্ছে। কোম্পানির উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, কিন্তু অনেক জায়গায় স্থায়ী চাকরি কমে গিয়ে বাড়ছে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক ও গিগ কাজ।

আইএলও‑এর ILOSTAT ডেটা এবং বিশ্বব্যাংকের Jobs & Development বিশ্লেষণ দেখায়, আগামী এক দশকের মধ্যে বহু উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশে রুটিন ধরনের কাজের বড় অংশ অটোমেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “technological rent”—অর্থাৎ অটোমেশন ও AI‑এর মাধ্যমে যে অতিরিক্ত আয় বা মুনাফা তৈরি হয়, তার বড় অংশ যদি মূলত পুঁজি‑মালিক ও প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, আর শ্রমিকদের কাছে খুব কম যায়, তখন প্রযুক্তি নিজে সমতা তৈরি করে না, বরং বৈষম্য আরও বাড়ায়।

প্রশ্ন হলো: টেকনোলজিকাল রেন্ট থেকে সাধারণ মানুষের ভাগ কতটা? যদি উত্তর হয়—খুব সামান্য—তবে নিওলিবারেল যুগে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, অটোমেশন তা আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

এখানেই বামধারার নীতি ধারণার নতুন প্রাসঙ্গিকতা আসে—যেমন ধনকর, ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI), ডিজিটাল যুগের শ্রমিক অধিকার, ও সবুজ ও ন্যায্য শিল্পনীতি।

বামধারার নীতি: সমতা রক্ষার বাস্তব উপায়

এই প্রেক্ষাপটে বামধারার অর্থনৈতিক চিন্তাকে অনেকেই আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং বাস্তব নীতি‑টুলবক্স হিসেবে নতুন করে দেখছেন।

১. প্রগতিশীল কর ও ধনকর
পিকেটি থেকে শুরু করে অনেক অর্থনীতিবিদই প্রস্তাব করছেন, শীর্ষ ১–৫% ধনী ও বড় কর্পোরেশনের ওপর উচ্চতর কর আরোপ করে সেই অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। পিকেটির প্রস্তাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক ধনকর প্রবর্তন করলে ধনীরা করস্বর্গে সম্পদ লুকিয়ে রাখার সুযোগ কিছুটা হলেও কমে যাবে।

২. ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI)
UBI ধারণা অনুযায়ী, কাজ থাকুক বা না থাকুক, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক একটি ন্যূনতম আয় নিশ্চিত পাবে। Stanford Basic Income Lab‑এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ছোট পরিসরে UBI পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে। অটোমেশনের যুগে এটি হতে পারে টেকনোলজিকাল রেন্টের একটি অংশ সরাসরি মানুষের জীবনে ফেরত দেওয়ার উপায়।

৩. ডিজিটাল ইউনিয়নাইজেশন ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকের অধিকার
উবার, ফুড ডেলিভারি, রাইড‑শেয়ারিং, অনলাইন ফ্রিল্যান্স—এসব প্ল্যাটফর্মে কাজ করা লক্ষ লক্ষ মানুষ অনেক সময় আইনের চোখে স্বনিয়োজিত ঠিকাদার হিসেবে গণ্য হয়, ফলে শ্রম আইনের অনেক সুরক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত থাকে।

ইউরোপীয় কমিশনের Platform Work Initiative প্রস্তাব করছে, অনেক প্ল্যাটফর্ম কর্মীকে কর্মচারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এটি ২১ শতকের শ্রম আন্দোলনের নতুন ফ্রন্ট—কারখানার গেটের পাশাপাশি এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনেও শ্রমিকের লড়াই।

৪. ইকো‑সোশ্যালিস্ট শিল্পনীতি
জলবায়ু সংকটের যুগে অর্থনীতি, সমতা ও পরিবেশকে আলাদা করে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। ইকো‑সোশ্যালিস্ট প্রস্তাবগুলো বলছে:

  • জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকি ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া,
  • সেই অর্থ নবায়নযোগ্য শক্তি, গণপরিবহন ও সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ করা,
  • আর এসব প্রকল্পে শ্রমিক ও কমিউনিটির মালিকানা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

এভাবে একসাথে কার্বন নিঃসরণ কমানো ও ন্যায্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি—দুটো লক্ষ্যই অর্জনের চেষ্টা করা হয়।

৫. গ্লোবাল মিনিমাম কর্পোরেট ট্যাক্স
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যাতে করস্বর্গে মুনাফা সরিয়ে কম কর না দিতে পারে, সে জন্য OECD/G20‑এর Inclusive Framework on BEPS ১৫% গ্লোবাল মিনিমাম কর্পোরেট ট্যাক্স প্রস্তাব করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আগামীতে এই ফ্লোর আরও উঁচুতে তোলা দরকার, যাতে দেশগুলো কর কমিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের সুযোগ নষ্ট না করে।

এই সব নীতির মূল কথা একটাই: বাজার থাকবে, কিন্তু তার ফলাফল গণতান্ত্রিকভাবে নির্ধারিত সমতা ও ন্যায্যতার মানদণ্ডে পুনর্বণ্টিত হবে।

উপসংহার: বাজার টিকে থাকবে, সমতা টিকবে কি?

চার দশকের নিওলিবারেল অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে—বাজারকে মুক্ত রাখলে অর্থনীতি অবশ্যই বড় হয়, কিন্তু সমতা নিজে নিজে আসে না। গিনি সূচক, শ্রমের আয়ের অংশ, সামাজিক নিরাপত্তার অবস্থা—সব মিলে এই কথাই বারবার ফিরে আসে।

স্ক্যান্ডিনেভিয়া দেখায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি থাকলে উন্মুক্ত বাজারের ভেতরেও তুলনামূলক সমতা বজায় রাখা যায়। চীন দেখায়, রাষ্ট্র চাইলে বাজারের অতিরিক্ত বৈষম্য ঠেকাতে হাইব্রিড মডেল তৈরি করতে পারে, যদিও সে পথে রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন জটিল হয়ে ওঠে। লাতিন আমেরিকা দেখায়, বামধারার নীতিতে দ্রুত দারিদ্র্য কমানো সম্ভব, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া সেই অর্জন ভঙ্গুর থাকে।

অটোমেশন, AI ও জলবায়ু সংকট–নির্ভর ভবিষ্যতে প্রশ্নটি আরও তীব্র হবে: শুধু বাজার টিকিয়ে রাখা নয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, শ্রমের মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার টিকিয়ে রাখতে আমরা কী করব?

উত্তর একক নয়, কিন্তু দিকনির্দেশনা পরিষ্কার। প্রগতিশীল কর, শক্তিশালী কল্যাণরাষ্ট্র, শ্রমিক অধিকার, গিগ‑ওয়ার্কারদের সুরক্ষা, সবুজ ও ন্যায্য শিল্পনীতি, গ্লোবাল কর ন্যায়বিচার—এসব ছাড়া সমতা রক্ষা করা কঠিন।

বাজার সম্ভবত টিকে থাকবে—কিন্তু সমতা টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে আমাদের আজকের নীতি‑পছন্দ, রাজনৈতিক লড়াই ও সামাজিক চাপের ওপর। বামধারার নীতি ধারণা তাই আজ আর শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; বরং নিওলিবারেল বিশ্বে টেকসই গণতন্ত্র ও মানবিক সমাজ বাঁচিয়ে রাখার এক বাস্তব উপায় হয়ে উঠেছে।


সূত্র (সবগুলো ক্লিকযোগ্য ও যাচাইযোগ্য)

 

Tuhin Sarwar
Tuhin Sarwarhttps://tuhinsarwar.com/
Investigative journalist and author Tuhin Sarwar covers human rights, the Rohingya crisis, climate change, and AI governance and accountability through data-driven journalism, field research, and evidence-based reporting