Home Uncategorized ২০ হাজার কি:মি: খাল কেটে কুমির আসছে না তো !

২০ হাজার কি:মি: খাল কেটে কুমির আসছে না তো !

0
1

তুহিন সারোয়ার :

সাল ২০৩১, কল্পনা করুন  আপনি ঘুম থেকে উঠে জানালা খুললেন, পাশের বাড়ির বারান্দায় বিশাল রেইনট্রি গাছ আপনাকে গুড মর্নিং জানাচ্ছে। ঘর থেকে পা ফেলতেই ২০ হাজার কিমি লম্বা খালের পানি বয়ে গেছে আপনার বাড়ির উঠোনে, মাঝে মাঝে ঠেউ এসে আপনার ড্রয়িংরুমের সোফা ভিজিয়ে দিচ্ছে। অবাক হবার হবার কিছু নেই ! বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ‘সবুজ ইশতেহার’ এমনই এক রুপকথায় দুনিয়া দেখাচ্ছে।

তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন ক্ষমতায় এলে বছরে ৫ কোটি, অর্থাৎ পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে এবং ২০ হাজার কিমি খাল খনন করা হবে। শুনতে এটা  আলাদিনের চেরাগ’ বাস্তবে যা সম্ভব নয় ।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ঘনবসতি, সীমিত জমি, নদী ও খালের দখল-দূষণ সব মিলিয়ে পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা এখানে প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলো নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে।

 


২৫ কোটি গাছ মানে কেবল সংখ্যা নয়, এটি বাস্তবের একটি বড় সমস্যা। আমাদের ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে, যেখানে ১৭ কোটি মানুষের পা ফেলার জায়গা কম, সেখানে ৩,০০০ বর্গকিলোমিটার নতুন অরণ্য কোথায় তৈরি হবে ? বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ৬০.৬% ভূমি আবাদযোগ্য বা ফসলি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং মাত্র ~১৪.৪৯% এলাকা বনভূমি আছে।

  • একটি গাছের জন্য গড়ে ১০–১৫ বর্গমিটার জায়গা লাগে।
  • ২৫ কোটি গাছের জন্য প্রয়োজন হবে ২,৫০০–৩,৭৫০ বর্গকিমি জমি।
  • https://data.worldbank.org/indicator/AG.LND.ARBL.ZS?locations=BD&utm
  • এই পরিমাণ জমি বাংলাদেশে পাওয়া কঠিন কারণ তা সরাসরি কৃষিজমি বা বসতির অন্যতম অংশকে প্রতিস্থাপিত করবে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবনধারার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

প্রতিশ্রুতির বিশ্লেষণ

গাণিতিক হিসাব বলছে, ২৫ কোটি মাঝারি আকারের গাছ দাঁড়াতে হলে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩,০০০ বর্গকিলোমিটার জমি। Bangladesh Forest Department, 2025। বাংলাদেশের মোট জমির মধ্যে বনভূমির অংশ মাত্র ১৪.৪৯% World Bank, 2025। আর ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ অনুযায়ী, কৃষিজমি কমছে, নগরায়ণ বাড়ছে Bangladesh Delta Plan 2100. ১৭ কোটি মানুষের দেশটিতে, এই বিশাল অরণ্য কোথায় বসানো হবে শোবার ঘর থেকে কি কিছু জমি ছিনিয়ে নেব ? টিকে থাকার হার (survival rate) এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদী তদারকি ছাড়া কেবল সংখ্যা দেখালে, তা কেবল ‘গ্রিনওয়াশিং’। World Resources Institute, 2020.

গড়ে একটি গাছের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ১০–১৫ বর্গমিটার জমি। ২৫ কোটি গাছ লাগাতে প্রয়োজন হবে ২,৫০০–৩,৭৫০ বর্গকিমি। এই ভূমি কোথা থেকে আসবে ফসলি জমি, বসতভিটা, নাকি বনভূমি ? স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. নাসরিন রহমান বলেন,  প্রতি বছর ৫ কোটি করে গাছ লাগাতে হলে, যা পাঁচ বছরে ২৫ কোটি হবে। বড় প্রজাতির গাছ যেমন রেইনট্রি, যার জন্য প্রতি গাছ গড়ে ১০–১৫ বর্গমিটার জায়গা প্রয়োজন

  • বাংলাদেশে বনভূমি বর্তমানে মাত্র ১৪.৪৯% এবং কৃষি, শহর, অবকাঠামো মিলিয়ে জমি সীমিত।

প্রশ্ন উঠে তাহলে এই গাছগুলো কোথায় লাগানো হবে ? কৃষিজমি ব্যবহার করলে খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে। বনভূমি ব্যবহার করলে সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘিত হবে। বাস্তবতা দেখায়, এমন বিশাল জমি বের করা প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব

ডা. সৈকত হোসেন, (আইইডি): জানান, দেশে বিদ্ধমান বনভূমি রক্ষা না করে নতুন বন তৈরি করা, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, টেকসই নয়। নগর এলাকায় লাগানো গাছের ৬০%–৭০% বছর দুয়েকের মধ্যে মারা যায়, মূলত জৈব পানি সংক্রান্ত অবকাঠামোর অভাবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ক্ষমতায় এলে ৫ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগাবেন এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করবেন।
২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন

আন্তর্জাতিক উদাহরণ

ফিলিপাইন:
ফিলিপাইন সরকার ২০১১ সালে তাদের ‘ন্যাশনাল গ্রিনিং প্রোগ্রাম’ (NGP) শুরু করে। দেশটির অডিট কমিশন (COA) এবং গবেষণা সংস্থা PIDS-এর প্রতিবেদনে এই ব্যর্থতার চাঞ্চল্যকর কারণগুলো উঠে আসে:
  • ভুল জায়গায় চারা রোপণ: মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা না করেই পাথুরে পাহাড় বা অনুর্বর জমিতে গাছ লাগানো হয়েছিল।
  • অনুপযুক্ত প্রজাতি: অনেক জায়গায় ম্যানগ্রোভের চারা এমন স্থানে লাগানো হয়েছিল যেখানে জোয়ারের পানি পৌঁছায় না, ফলে প্রায় ৯৮ শতাংশ চারাই মারা গেছে
তুরস্ক: 
২০১৯ সালে তুরস্ক একদিনে ১১ মিলিয়ন চারা রোপণ করে বিশ্বরেকর্ড গড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তুরস্কের কৃষি ও বনজ শ্রমিক ইউনিয়ন (Tarim Orman-Is) জানায়, রোপণের কয়েক মাসের মধ্যেই ৯০ শতাংশ চারা মারা যায়। কারণ ছিল অত্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে এবং বৈজ্ঞানিক তদারকি ছাড়াই চারাগুলো লাগানো হয়েছিল।
চীন: বনায়নের নামে পানিসংকট
চীনের ‘গ্রেইন ফর গ্রিন’ কর্মসূচিতে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রজাতির বদলে পাইন জাতীয় গাছ লাগানোয় অনেক এলাকায় গাছের টিকে থাকার হার ছিল মাত্র ২২ থেকে ২৫ শতাংশ। এই ভুল প্রজাতির গাছগুলো মাটির অবশিষ্ট পানি শুষে নিয়ে উল্টো পানিসংকট তৈরি করেছিল।
ভারত: 
উত্তর ভারতে কয়েক দশক ধরে চলা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়ে করা একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, কোটি কোটি গাছ লাগানো সত্ত্বেও তা বনের ঘনত্ব বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে চারা লাগানোর সংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়াকে দায়ী করা হয়েছে।

২০ হাজার কিমি খাল: কেটে নোনা জলের কুমির আনা হবে ?

তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন ১২ হাজার মাইল বা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। Water Resources Ministry Annual Report, 2025. রিপোর্ট বলছে ,বাংলাদেশ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বছরে বড়জোর ৪৫০-৫৫০ কিমি খাল খনন করতে সক্ষম অর্থাৎ, লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বর্তমান ক্ষমতার চেয়ে ৪০ গুণ বেশি কোদাল ও শ্রমের দরকার। এমনকি সুপারম্যানও এই গতিতে খাল খুঁড়তে পারবে কি না সন্দেহ কেননা – ২০,০০০ কিমি মানে হলো এটা বর্তমান সরকারি ক্ষমতার কয়েক ডজন গুণ।  এগুলো প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি ছাড়া করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এটা শুধু কোদাল হাতে কোন্দলে সম্ভব নয়।

রাজনীতিতে বড় প্রতিশ্রুতির একটি আলাদা নাম আছে Political Signaling। অর্থাৎ ভোটারদের এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া, যা মানুষের কানে ভালো শোনায়, আশা জাগায়, কিন্তু বাস্তবায়ন কখনও সম্ভব হয়না।

 উপসংহার : ভোটাররা এখন একটু সচেতন হোন। প্রশ্ন করুন গাছ তো লাগাবেন, জমি কোথা থেকে আসবে ? খাল খনন করব, কিন্তু পানি কি আসবে না লোনা জল দিয়ে ?  গ্রাম বাংলার একটি বহুল পুরোনো প্রবাদ- খাল কেটে কুমির আনা প্রবাদটি হয়তো এমনি এমনি তৈরি হয়নি, তাইতো খাল কাটার আগে একটু ভাবুন, খাল কেটে কুমির আনছেন না তো ?

তাই খাল কাটার আগে একটু তাকিয়ে দেখুন 
পানি আসছে তো ?
নাকি কোথাও নীরবে কুমির নড়ছে ?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here