তুহিন সারোয়ার । ২০ ডিসেম্বর। ২০২৫। বাংলাদেশ ।
স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার আছে। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২০ থেকে ২৬টি ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, স্যাটেলাইটের প্রায় অর্ধেক ক্ষমতা (৪০-৫০%) দীর্ঘ সময় ধরে অলস পড়ে আছে ।
বাংলাদেশের প্রথম ভূ–স্থির যোগাযোগ উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ যখন ২০১৮ সালের মে মাসে মহাকাশে পাঠানো হয়, তখন এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত অর্জন হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল। সরকারিভাবে বলা হয়েছিল, এই স্যাটেলাইট বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরতা কমাবে, প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক যোগাযোগ হাবে পরিণত করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল—সাত বছরের মধ্যেই এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা সম্পূর্ণ অর্থ রাষ্ট্র ফিরে পাবে।
কিন্তু উৎক্ষেপণের ছয় বছরের বেশি সময় পর, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রকাশিত একাধিক অডিট ও তদন্ত প্রতিবেদনের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে—এই আশাবাদী উপস্থাপনার সঙ্গে প্রকৃত বাস্তবতার ব্যবধান ছিল কাঠামোগত ও দীর্ঘস্থায়ী। আর্থিক হিসাব, বাণিজ্যিক সক্ষমতা, ফ্রিকোয়েন্সি পরিকল্পনা এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা—প্রতিটি স্তরে এমন তথ্য উঠে এসেছে, যা হয় গোপন রাখা হয়েছিল, নয়তো আংশিক ও বিভ্রান্তিকরভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) বছরের পর বছর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট প্রকল্পটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা সংস্থা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)–এর পর্যবেক্ষণে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর বার্ষিক Depreciation বা অবচয় ব্যয় প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা, যা নিয়মিতভাবে আয়–ব্যয়ের মূল হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাব মানদণ্ড (IFRS) অনুযায়ী, বড় অবকাঠামো ও মহাকাশ প্রকল্পে অবচয় ব্যয় বাদ দিয়ে লাভ দেখানোকে বিভ্রান্তিকর আর্থিক চর্চা হিসেবে গণ্য করা হয়
(CAG Audit Report, Bangladesh, 2024: https://cag.gov.bd)।
এই অবচয় ব্যয় যুক্ত করলে দেখা যায়, স্যাটেলাইট প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)–এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, লাভের যে চিত্র সরকারিভাবে দেখানো হয়েছে, তা প্রকৃত নগদ প্রবাহের প্রতিফলন নয়, বরং হিসাবরক্ষণগত পুনর্বিন্যাসের ফল
https://www.ti-bangladesh.org
উৎক্ষেপণের সময় যে প্রতিশ্রুতিটি সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছিল, তা ছিল বিনিয়োগ ফেরত। জাতীয় সংসদে এবং সরকারি প্রচারপত্রে বলা হয়েছিল, সাত বছরের মধ্যেই—অর্থাৎ ২০২৫ সালের মধ্যে—এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা কয়েক হাজার কোটি টাকা পুরোপুরি উঠে আসবে
http://www.parliament.gov.bd
কিন্তু বর্তমান আয়, পরিচালন ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক রাজস্ব বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)–এর সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই লক্ষ্য শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত ছিল না। OECD–এর স্পেস ইকোনমি রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্যাটেলাইটটির ১৫ বছরের কার্যকর মেয়াদের মধ্যেও বিনিয়োগ পুরোপুরি ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত
(OECD Space Economy Report 2023: https://www.oecd.org/space)।
বাণিজ্যিক সক্ষমতার প্রশ্নে সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় ট্রান্সপন্ডার ব্যবহারের পরিসংখ্যানে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১–এ মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৬টি। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবহৃত থেকেছে। আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট শিল্পে যেখানে ৮০ শতাংশ utilisation rate–কে বাণিজ্যিক সফলতার মানদণ্ড ধরা হয়, সেখানে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট–১ সেই মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে
www.itu.int
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যান্ডউইডথ বিক্রির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে ইউরোকনসাল্টসহ একাধিক বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা
(Euroconsult Satellite Market Forecast: https://www.euroconsult-ec.com)।
এই ব্যর্থতার পেছনে যে কারিগরি ও কৌশলগত কারণগুলো ছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফ্রিকোয়েন্সি ও কক্ষপথ–সংক্রান্ত জটিলতা। স্যাটেলাইটটি ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে স্থাপনের আগে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয় নিয়ে যে আপত্তি ও বিলম্ব ছিল, তা উৎক্ষেপণের সময় জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU)–এর নথি অনুযায়ী, এই সমন্বয় জটিলতার কারণে সম্ভাব্য কিছু বিদেশি গ্রাহক সেবা নিতে আগ্রহ হারায়
(ITU Orbital Slot Coordination Filings: https://www.itu.int/en/ITU-R/space)।
প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামো নিয়েও স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। সরকারি নথি অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১–এর নির্মাণ, উৎক্ষেপণ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৭৬৫ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা। অথচ এই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে কী পরিমাণ আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সুফল পাওয়া গেছে—তা নিয়ে সংসদে বা জনগণের কাছে কোনো স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ cost–benefit বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়নি
ফ্রিকোয়েন্সি জটিলতা: যে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি
স্যাটেলাইটটি ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে স্থাপনের আগে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয় সংক্রান্ত জটিলতা ছিল—যা উৎক্ষেপণের সময় জনসমক্ষে তেমনভাবে আলোচনা হয়নি।
ITU–এর নথি অনুযায়ী, এই কক্ষপথ ও ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের আপত্তি ও সমন্বয় বিলম্বিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক গ্রাহক চুক্তি চূড়ান্ত করতে সমস্যা হয়।
→ ITU Orbital Slot Coordination Filings
https://www.itu.int/en/ITU-R/space
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়টি আগে থেকেই স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হলে প্রকল্পের বাণিজ্যিক ঝুঁকি নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় আলোচনা সম্ভব হতো।
ব্যয়: ২,৭৬৫ কোটি থেকে ৩,০০০ কোটি—কিন্তু জবাবদিহিতা কোথায়?
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২,৭৬৫ কোটি থেকে প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা। তবে এত বড় ব্যয়ের বিপরীতে—
সংসদে পূর্ণাঙ্গ cost–benefit বিশ্লেষণ উপস্থাপন হয়নি
জনসমক্ষে কোনো independent white paper প্রকাশ করা হয়নি
বাণিজ্যিক ব্যর্থতার দায় কার—তা নির্দিষ্ট হয়নি
→ Centre for Policy Dialogue (CPD) Policy Review
https://cpd.org.bd
সমালোচকদের মতে, এই জবাবদিহিতার অভাবই প্রকল্পটিকে একটি “symbolic success but economic liability”–তে পরিণত করেছে।
মানবিক প্রভাব: যেটুকু উপকার, সেটুকু কোথায় ?
এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য স্যাটেলাইটটির সব অর্জন অস্বীকার করা নয়। বাস্তবে এটি—
দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার খরচ কিছুটা কমিয়েছে
চর, দ্বীপ ও দুর্গম এলাকায় সীমিত ইন্টারনেট সংযোগে সহায়তা করেছে
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সীমিত সুবিধার জন্য কি কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ন্যায্য ছিল?
→ UN Broadband Commission Reports
https://www.broadbandcommission.org
নাম পরিবর্তন: রাজনৈতিক প্রতীক সরালেও বাস্তবতা কি বদলেছে?
২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্যাটেলাইটটির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট–১ রাখে এবং গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো থেকেও রাজনৈতিক নাম বাদ দেয়।
→ Government Gazette, Bangladesh, 2025
http://www.mopa.gov.bd
কিন্তু নাম বদলালেও অডিট রিপোর্ট, লোকসানের হিসাব এবং বাণিজ্যিক বাস্তবতা অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
লাভজনক প্রকল্প বনাম অডিটের ভাষা
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) দীর্ঘদিন ধরে বার্ষিক প্রতিবেদনে দাবি করে এসেছে যে স্যাটেলাইট প্রকল্পটি লাভজনক। কিন্তু কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)–এর অডিট পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই লাভের হিসাব দাঁড় করানো হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ খরচ বাদ দিয়ে—Depreciation।
অডিট অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১–এর বার্ষিক অবচয় ব্যয় প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। এই খরচটি নিয়মিতভাবে আয়–ব্যয়ের মূল হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, ফলে কাগজে–কলমে কোম্পানিকে লাভজনক দেখানো সম্ভব হয়েছে
→ CAG Audit Observation (Bangladesh), 2024
https://cag.gov.bd
যদি আন্তর্জাতিক হিসাব মানদণ্ড (IFRS) অনুযায়ী অবচয় যুক্ত করা হয়, তাহলে চিত্রটি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। প্রকৃত হিসাবে দেখা যায়, স্যাটেলাইটটি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা নিট লোকসান দিচ্ছিল—যা সরকারিভাবে কখনোই জোরালোভাবে স্বীকার করা হয়নি।
→ Transparency International Bangladesh (TIB) Analysis
https://www.ti-bangladesh.org
বিনিয়োগ ফেরত: সাত বছরের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে অসম্ভব সমীকরণ
উৎক্ষেপণের সময় সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যেই—অর্থাৎ সাত বছরের মধ্যে—এই স্যাটেলাইট থেকে পুরো বিনিয়োগ ফেরত আসবে। এই বক্তব্য তৎকালীন সংসদ অধিবেশন ও সরকারি প্রচারপত্রে বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়।
→ Bangladesh Parliament Proceedings Archive
http://www.parliament.gov.bd
এই স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার আছে। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২০ থেকে ২৬টি ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, স্যাটেলাইটের প্রায় অর্ধেক ক্ষমতা (৪০-৫০%) দীর্ঘ সময় ধরে অলস পড়ে আছে।
বিশ্বের বড় বড় স্যাটেলাইট কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU)-এর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো স্যাটেলাইটকে তখনই সফল বলা হয় যখন এর অন্তত ৮০% ক্ষমতা ভাড়া দেওয়া সম্ভব হয়। অথচ আমাদের স্যাটেলাইটটি এই সীমার অনেক নিচে অবস্থান করছে।
- দক্ষ ব্যবহারের অভাব: আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী মহাকাশের কক্ষপথ এবং সিগনাল ফ্রিকোয়েন্সি হলো মূল্যবান সম্পদ। অর্ধেক ক্ষমতা ব্যবহার না হওয়া মানে হলো এই মূল্যবান সম্পদের অপচয়।
- বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতা: বর্তমানে ইলন মাস্কের স্টারলিংক বা আধুনিক হাই-স্পিড স্যাটেলাইটগুলোর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রথাগত স্যাটেলাইটের চাহিদা কমে যাচ্ছে। ফলে অব্যবহৃত অংশ ভাড়া দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সহজ কথায় বলতে গেলে, একটি বড় দোকানঘর ভাড়া নিয়ে যদি তার মাত্র অর্ধেকটা ব্যবহার করা হয়, তবে তা লোকসান। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটছে। আন্তর্জাতিক সফলতার মাপকাঠি (৮০% ব্যবহার) স্পর্শ করতে হলে আমাদের দ্রুত বিদেশি গ্রাহক খুঁজে বের করতে হবে এবং দেশেও এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। অন্যথায় এই বিশাল বিনিয়োগ থেকে আশানুরূপ লাভ পাওয়া সম্ভব হবে না।
স্যাটেলাইটটির অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হওয়ার কথা ছিল ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যান্ডউইডথ বিক্রি। কিন্তু বাস্তবে ২০২4 সাল পর্যন্ত দেখা যায়—
- মোট ট্রান্সপন্ডার: ৪০টি
- সক্রিয় ব্যবহার: ২০–২৬টি
বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশের লক্ষ্য প্রায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে একাধিক বাণিজ্যিক বিশ্লেষণ।
→ Euroconsult Satellite Market Forecast
https://www.euroconsult-ec.com
এই সব প্রশ্নের মাঝেও প্রকল্পটির কিছু বাস্তব উপকার অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার ব্যয় আংশিকভাবে কমেছে এবং চর, দ্বীপ ও দুর্গম অঞ্চলে সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে
(UN Broadband Commission Reports: https://www.broadbandcommission.org)।
তবে মানবিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে প্রশ্ন থেকেই যায় এই সীমিত সেবার জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ কতটা যৌক্তিক ছিল এবং বিকল্প পরিকল্পনা থাকলে কি একই সেবা আরও কম ব্যয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না?
২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্যাটেলাইটটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’ রাখে এবং গাজীপুর ও বেতবুনিয়ার গ্রাউন্ড স্টেশন থেকেও রাজনৈতিক নাম বাদ দেয়। সরকার বলেছে, এটি প্রকল্পকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার একটি পদক্ষেপ। এই সিদ্ধান্ত দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত হলেও বিশ্লেষকদের মতে, নাম পরিবর্তন প্রতীকী হলেও প্রকল্পের আর্থিক ও কাঠামোগত সমস্যার সমাধান এতে হয়নি
(সূত্র: https://online-bn-d11.thedailystar.net/news/bangladesh/news-655526)।
মাঠপর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, দুর্গম ও দ্বীপাঞ্চলে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট কিছু মানুষের জন্য যোগাযোগ সহজ করেছে। একজন উপকূলীয় দ্বীপের শিক্ষক বলেন, “ইন্টারনেট থাকায় এখন অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিতে পারি।” এই মানবিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সীমিত সুবিধার জন্য কি হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যৌক্তিক ছিল, যখন ঘোষিত বৈদেশিক আয়ের লক্ষ্য পূরণই হয়নি?
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ প্রকল্পটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রচারের মধ্যকার সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি। অডিট, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং মাঠের বাস্তবতা দেখাচ্ছে—এই প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে তথ্য গোপন ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার সুযোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন এখন একটাই: ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্পগুলো কি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি “লাভের গল্প” আবারও বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে?
আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU) এর নীতিমালা অনুযায়ী, কক্ষপথ এবং স্পেকট্রাম সীমিত সম্পদ হওয়ায় এর “যৌক্তিক এবং দক্ষ ব্যবহার” নিশ্চিত করা সদস্য দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। বিস্তারিত জানুন: ITU Radio Regulations Framework.
বৈশ্বিক স্যাটেলাইট বাজার বিশ্লেষণী সংস্থা Euroconsult এবং NSR (Northern Sky Research)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮০% ইউটিলাইজেশন রেট হলো একটি স্যাটেলাইট প্রকল্পের ব্যবসায়িক সার্থকতা বা ‘গোল্ডেন স্ট্যান্ডার্ড’। বাজার বিশ্লেষণ দেখতে পারেন: Euroconsult Satellite Connectivity Reports.
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইট ফিলিং এবং বর্তমান ব্যবহারের কারিগরি তথ্য পাওয়া যাবে ITU SpaceExplorer পোর্টালে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর বর্তমান ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক অগ্রগতির অফিসিয়াল ডাটা পাওয়া যাবে BSCL Annual Statistics-এ।
স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড এবং কানেক্টিভিটি সংক্রান্ত বৈশ্বিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করুন ITU DataHub (2025).


