তুহিন সারোয়ার | ঢাকা। তারিখ: ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন মানেই শুধু ভোটগ্রহণের একটি দিন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আশা, উদ্বেগ, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ কী জানবে, কী বিশ্বাস করবে—তার বড় একটি অংশ নির্ভর করে সংবাদমাধ্যম কীভাবে তথ্য তুলে ধরছে তার ওপর।
তথ্য ও সম্প্রসারণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সম্প্রতি বলেছেন, নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিটি সময়েই গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। তাঁর মতে, নির্বাচনকে ঘিরে আশঙ্কা ও ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা থাকে, আর এই পরিস্থিতিতে ভুল বা যাচাইহীন তথ্য সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
নির্বাচন-পূর্ব সময়: তথ্যই হোক প্রধান শক্তি
নির্বাচনের আগে মানুষ জানতে চায়—কারা প্রার্থী, তারা কী করতে চায়, ভোট দেওয়ার নিয়ম কী। এই সময় গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো সহজ ভাষায় সঠিক তথ্য তুলে ধরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর খবর বেশি ছড়ায়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা International IDEA বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নির্বাচনের আগে ভুয়া তথ্য ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব দেখা যায়। তাই মূলধারার গণমাধ্যম যদি তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করে, তাহলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, নির্বাচন-পূর্ব সময়ে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ মানুষের আস্থা নষ্ট করে। মানুষ তখন আর বুঝতে পারে না—কোন খবর সত্য, কোনটি প্রচারণা।
ভোটের দিন: গতি নয়, সত্যটাই মুখ্য
ভোটের দিন সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। কোথায় কী ঘটছে, ভোট শান্তিপূর্ণ হচ্ছে কি না—সব খবর মানুষ দ্রুত জানতে চায়। কিন্তু দ্রুত খবর দিতে গিয়ে ভুল হলে তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
মানবাধিকার সংস্থা Article 19 জানিয়েছে, নির্বাচনের দিনে ভুল বা অতিরঞ্জিত সংবাদ অনেক সময় আতঙ্ক ছড়ায় এবং সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। একটি ভুল শিরোনাম বা অসম্পূর্ণ ভিডিও পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক বলেন, ভোটের দিনে সাংবাদিককে খুব সতর্ক থাকতে হয়। সব তথ্য যাচাই করে, সংযত ভাষায় সংবাদ প্রকাশ করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়: দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়
অনেকে মনে করেন ভোট শেষ হলেই গণমাধ্যমের কাজ শেষ। কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় শুরু হয় এরপর। নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে এলো, কোথাও অনিয়ম হয়েছে কি না, প্রশাসনের ভূমিকা কেমন ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব গণমাধ্যমের।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জানিয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী অনুসন্ধান না হলে অনিয়মের অভিযোগগুলো চাপা পড়ে যায়। এতে ভবিষ্যতে একই সমস্যা আবারও দেখা দেয়।
সাংবাদিক সুরক্ষা: দায়িত্ব পালনের শর্ত
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা তখনই সম্ভব, যখন সাংবাদিক নিজে নিরাপদ থাকেন। বাংলাদেশে বহু সাংবাদিক পেশাগত কাজ করতে গিয়ে হুমকি, মামলা বা হামলার শিকার হন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এই কারণেই ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাহফুজ আলম বলেছেন, গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে কারও প্রশ্ন থাকলে তা উত্থাপন করা উচিত এবং সাংবাদিক সুরক্ষা আইন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিক নিরাপদ না হলে তিনি সত্য তুলে ধরতে পারবেন না। তখন নির্বাচন সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জনসমক্ষে আসবে না।
ডিজিটাল যুগের নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে বর্তমানে ১৩ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ফলে একটি খবর মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ভালো তথ্য যেমন দ্রুত ছড়ায়, তেমনি গুজবও ছড়ায় খুব সহজে।
এই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা-ই ছড়াক না কেন, মানুষ এখনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের জন্য মূলধারার গণমাধ্যমের দিকেই তাকিয়ে থাকে।
উপসংহার
একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়। এর সঙ্গে জড়িত গণমাধ্যম, সাংবাদিক, রাজনৈতিক দল এবং পুরো সমাজ। গণমাধ্যম যদি দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও মানবিক থাকে, তাহলে মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
গণমাধ্যম সংস্কার, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন এবং স্বচ্ছ নির্বাচন রোডম্যাপ—এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িত। এগুলো নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সময়মতো সেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারব?.


